একাদশীর উপবাস ব্রত মাহাত্ম্য

একাদশী ব্রত মাহাত্ম্য

একাদশীর ব্রত মাহাত্ম্য বর্ণনায় ভদ্রশীল, কোটিরথ ও সুপ্রজ্ঞা এবং মহারাজ রুক্মাঙ্গদ কাহিনী অন্যতম। একাদশী উপবাস ব্রত পালন করে এই মাহাত্ম্য পাঠ করলে একাদশীর যথার্থ পূণ্য লাভ হয়। যদি কেউ একাদশীর উপবাস কালে মাহাত্ম্য পাঠ না করে তবে তাঁর একাদশী ব্রত অপূর্ণ থেকে যায়।

-:একাদশীব্রত্য মাহাত্ম্য:-

ভদ্রশীলের কাহিনীঃ

পুরাকালে গালব নাম এক মহান মুনি নর্মদা নদীর তীরে বাস করতেন। তাঁর ভদ্রশীল নামে এক বিষ্ণুভক্ত পুত্র ছিল। সে ছোটবেলা থেকে বিষ্ণুমূর্তি বানিয়ে পূজা করতে। বালক হয়েও লোককে বিষ্ণুপূজার উপদেশ ও একাদশী পালন করতে নির্দেশ দিত, নিজেও পালন করতে। পিতা একদিন জিজ্ঞাসা করেন- “আচ্ছা ভদ্রশীল! তুমি অতি ভাগ্যবান। তুমি বলো তো, রোজ শ্রীহরির পূজা করা, একাদশী তিথি পালন করা-এরূপ ভক্তি কিভাবে তোমার উদয় হল?”

উত্তরে ভদ্রশীল বলতে লাগল-বাবা! আমি পূর্বজন্মের কথা ভুলিনি। আগের জন্মে যমপুরীতে গিয়েছিলাম। সেখানে যমরাজ আমাকে এ বিষয়ে উপদেশ করেছিলেন। পিতা অত্যন্ত বিস্মিত হয়ে বললেন-ভদ্রশীল, তুমি পূর্বে কে ছিলে? যমরাজ তোমাকে কি বলেছিল, সব কিছুই আমাকে বলো।

ভদ্রশীল বলল- বাবা! আমি পূর্বে চন্দ্রবংশের এক রাজা ছিলাম। তখন আমার নাম ছিল ধর্মকীর্তি। ভগবান দত্তাত্রেয় আমার গুরু ছিলেন। নয় হাজার বছর আমি পৃথিবী শাসন করেছিলাম। বহু ধর্ম-কর্ম করেছিলাম। পরে যখন আমার অনেক ধনসম্পদ হল তখন আমি পাগলের মতো অধর্ম করতে লাগলাম। কতগুলি পাষণ্ড ব্যক্তির সঙ্গে আলাপ করতাম। আর কেবল কথা আলাপের ফলেই আমার বহু দিনের অর্জিত পূণ্য নষ্ট হয়ে গেল। আমিও পাষাণ্ডী হয়ে গেলাম। তাদের কু-যুক্তি নিয়ে যাগযজ্ঞ আদি পূণ্যকর্ম বাদ দিলাম। ফলে আমার সব প্রজারাও অধর্ম করতে লাগল। প্রজাদের প্রত্যেকের অধর্মের ছয় ভাগের এক ভাগ রাজাকেই গ্রহণ করতে হয়।

তারপর একদিন আমি সৈন্যদের সঙ্গে বনে মৃগয়া করতে গেলাম। বহু পশু বধ করলাম। তারপর আমি ক্ষুধা তৃজ্ঞায় কাতর ও ক্লান্ত হয়ে রেবা নদীর তীরে গেলাম। প্রখর রোদে তপ্ত হয়ে নদীতে স্নান করলাম। কিন্তু তারপর আমার কোন সেনাকে দেখতে না পেয়ে চিন্তিত ও অতিশয় ক্ষুর্ধাত হলাম। অন্ধকার হয়ে এল। আমি পথ ঠিক করতে পারলাম না। তারপর এক জায়গায় গিয়ে কয়েকজন তীর্থবাসীকে দেখলাম। জানলাম তারা একাদশী ব্রত করেছে। তারা সারাদিন কিছু খায়নি, জলপান পর্যন্তও করেনি। আমি তাদের সঙ্গে পঢ়ে রাত্রি জাগরণ করলাম। কিন্তু ক্লান্তি ক্ষুধা পিঁপাসায় কাতর হয়ে রাত্রি জাগরণের পর আমার মুত্যু হল। তখন দেখলাম বড় বড় দাঁত বিশিষ্ট দুজন ভয়ংকর যমদূত এসে আমাকে দড়ি দিয়ে বাঁধল। আর ক্লেশময় পথ দিয়ে আমাকে টেনে নিয়ে চলল। তারপর যমপুরীতে পৌঁছালাম। যমরাজও দেখতে তখন ভয়ংকর। যমরাজ চিত্রগুপ্তকে ডেকে আমাকে দেখিয়ে বললেন- পণ্ডিত! এই ব্যক্তি যেরূপ শিক্ষাবিধান তুমি তা বলো। চিত্রগুপ্ত কিছুক্ষণ বিচার করে ধর্মরাজ যমকে বললেন-হে ধর্মপাল! এই ব্যক্তি পাপকর্মেই রত ছিল সত্য, কিন্তু তবুও একাদশীর উপবাস জন্য সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত হয়েছে। তীর্থবাস ও রাত্রি-জাগরণও করেছে। তাই এর সব পাপ নষ্ট হয়েছে।

চিত্রগুপ্ত এই কথা বললে যমরাজ খুব চমেকে উঠলেন, তিন ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে ভুমিতে দণ্ডবৎ প্রণাম জানিয়ে আমাকে পূজা করতে লাগলেন। তারপর তাঁর দূতদের আহ্বান করে বলতে লাগলেন-হে দূতগণ! তোমরা ভাল করে আমার কথা শোনো। তোমাদের মঙ্গলজনক কথা আমি বলছি। যে সব মানুষ ধর্মরত, তোমরা তাদেরকে এখানে আনবে না। যাঁরা শ্রীহরির ভক্ত, পবিত্র, একাদশীব্রত পরায়ণ, জিতেন্দ্রিয় এবং যাঁদের মুখে সর্বদা ‘হে নারায়ণ, হে গোবিন্দ, হে কৃষ্ণ, হে হরি’ উচ্চরিত হয়, যাঁরা সকল লোকের হিতকারী ও শান্তিপ্রিয়, তাদেরকে তোমরা দূর থেকেই পরিত্যাগ করবে। কারণ সেই সব ব্যক্তিকে আমার শিক্ষা দেবার অধিকার নেই। যাঁরা সর্বদা হরিনামে আসক্ত, সর্বদা হরিকথা শ্রবণে আগ্রহী, যাঁরা পাষণ্ডগণের সঙ্গ করে না, ভক্তদের শ্রদ্ধা করে, সাধুসেবা অতিথিসেবা পরায়ণ, তাঁদেরকে পরিত্যাগ করবে।

হে দূতগণ! মোমরা শুধু তাদেরকেই আমার কাছে ধরে আনবে, যারা উগ্রস্বভাব, ভক্তদের অনিষ্ট করে, লোকদের সঙ্গে কলহ বাধায়, একাদশী ব্রত পালনে একান্ত পরাঙ্মুখ, পরনিন্দুক, ব্রাহ্মণের ধনে লোভ পরতন্ত্র, হরিভক্তি বিমুখ, যারা ভগবদ্‌ বিগ্রহ দেখে শ্রদ্ধাবত হয় না, মন্দির দর্শনে যাদের আগ্রহ নেই, অন্যের অপবাদ করে বেড়ায়, তাদের সবাইকে বেঁধে এখানে নিয়ে আসবে।

যমরাজের মুখে এসব কথা শুনে আমি আমার পাপকর্মের জন্য অত্যন্ত অনুশোচনা করতে থাকি। তারপর আমি সূর্যের মতো উজ্জ্বল দেহ লাভ করলাম। একটি দিব্য বিমানে চড়িয়ে আমাকে যমরাজ দিব্যলোকে পাঠিয়ে দিলেন। কোটি কল্প সেখানে অবস্থান করার পর ইন্দ্রলোক, স্বর্গে নেমে আসি। সেখানে বহুকাল যাবৎ অবস্থান কারার পর এই পৃথিবীতেক এসে সদাচারী মহান ব্রাহ্মণকুলে জন্মগ্রহণ করেছি।

আমার জাতিস্মরতা হেতু এসব ঘটনা আমার হৃদয়ে জাগ্রত আছে। আমি পূর্বে একাদশী ব্রত মাহাত্ম্য জানতাম না। অনিচ্ছাকৃতভিাবে যখন একাদশী পালনে এত ফল লাভ করেছি। তাহলে ভক্তি সহকারে একাদশী ব্রত উপবাস করলে কি প্রকার ফল লাভ হয় তা জানি না। তাই বৈকুন্ঠধামে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছায় আমি পবিত্র একাদশীব্রত ও প্রতিদিন বিষ্ণুপূজা করব এবং অন্যদেরও এসব পালন করতে উৎসাহী করব।

পুত্রের কথা শুনে গালব মুনি অতি সন্তুষ্ট হয়ে ভাবলেন, আমার বংশে এই পরম বিষ্ণুভক্তের জন্ম হয়েছে, তাই আমার জন্ম সফল, আমার বংশও পবিত্র হল।

((সূত্র: একাদশী মাহাত্ম্য))

কোটিরথ ও সুপ্রজ্ঞার কাহিনীঃ

পুরাকালে রাজা কোটিরথ ও রাণী সুপ্রজ্ঞা ধর্মনিষ্ঠাপরায়ণ সর্বসদ্‌গুণযুক্ত দম্পতি ছিলেন। তাঁরা জাতিস্মর ছিলেন। একাদশীতে তাঁরা জল পর্যন্ত গ্রহণ না করে শ্রীহরির পূজা কীর্তন ভজনে দিবারাত্র অতিবাহিত করতেন।

একদিন হরিবাসরে শৌরি নামে এক তত্ত্বজ্ঞ ব্রাহ্মণ এসে উপস্থিত হন। রাজা শ্রদ্ধাপূর্বক তাঁকে আসনে বসালেন। রাজদম্পতি সহ বহু ব্রতীকে দেখে অত্যন্ত খুশি হয়ে ব্রাহ্মণ প্রশ্ন করলেন- হে রাজন্‌। আপনারা উভয়েই ধন্য। আপনাদের মতো বৈষ্ণব এই জগতে দুর্লভ। আপনাদের এরকম বুদ্ধি কিভাবে হল? রাণী সুপ্রজ্ঞা বললেন- আমরা পূর্ব জন্মে মহাপাতকী ছিলাম। কিন্তু একাদশীর প্রভাবে যমদণ্ড থেকে মুক্ত হয়েছি। সেই স্মৃতি প্রভাবে শ্রীহরির অক্ষয় ধার্ম লাভের জন্য একাদশী ব্রত অনুষ্ঠান করছি।

ব্রাহ্মণ বললেন- যদি আপনার পূর্ব জীবনের কথা স্মরণ করতে পারেন, তবে কৃপা করে আমাকে বিস্তৃত বলুন।

সুপ্রজ্ঞা বলতে লাগলেন- যদিও সেই কথা অপ্রকাশ্য, তবুও মহান বৈষ্ণব আপনার কাছে বর্ণনা করব। আমি পূর্ব জন্মে চিত্রপদা নাম এক বারবনিতা ছিলাম। বহু পাপকর্ম করেছিলাম। এই রাজা নিত্যোদয় নামে এক শূদ্র ছিলেন। নানা অনাচারের জন্য জ্ঞাতিবন্ধুরা পরিত্যগ করলে ইনি আমার আশ্রয়ে থাকলেন। আমরা স্বামী-স্ত্রীর মতোই ছিলাম। একদিন মারাত্মক অসুখে পড়লাম। গায়ে প্রচণ্ড জ্বর।পীড়ায় কাতর হয়ে দিনরাত হে হরি! হে গোবিন্দ! হে নারায়ণ! আমাকে রক্ষা করুন- বলে কাঁদতে লাগলাম। রাত্রে ঘিয়ের প্রদীপ জ্বালিয়ে জেগেই থাকলাম। সারাদিন কোনও কিছু আহার করিনি, জলও নয়। আমার এরূপ অবস্থা দেখে ইনিও আহার পান না করে না ঘুমিয়ে আমার কাছে বসে শ্রীহরিকে ডাকতে লাগলেন।

পরদিন সূর্যোদয় কালে আমার মৃত্যু হয়। ইনিও অত্যন্ত কাতর হয়ে দেহত্যাগ করলেন। তারপর বিকট ভয়ংকর যমদূতেরা এসে আমাদের খুব শক্ত করে বেঁধে দুর্গম পথে যমপুরীতে নিয়ে গেল।

সেখানে যমরাজ আমাদের পাপ-পুণ্যের বৃত্তান্ত জানতে চিত্রগুপ্তকে নির্দেশ দিলেন। চিত্রগুপ্ত বললেন- ‘এরা অত্যন্ত পাপী হলেও একাদশীর উপবাস একদিন করেছে। তাই সর্বপাপ থেকে মুক্ত হয়েছে’।

একাদশী ব্রত সম্পর্কে কিছুই না জেনেও আমরা নির্জলা উপবাস থেকে রাত্রি জাগরণ এবং শ্রীহরির নাম করেই দ্বাদশীতে দেহ ত্যাগ করেছিলাম। সেটাই ছিল আমাদের জীবনের পরম সৌভাগ্য।

তখন শুনলাম আমাদের ভগবদ্ধামে গতি হবে। চিত্রগুপ্তের কথা শুনেই যমরাজ তৎক্ষণাৎ নানা সুগন্ধি পুষ্প, চন্দন, বস্ত্র, অলংকার, সুস্বাদু ভোজ্যদ্রব্য আমাদের প্রদান করে একটি রথের উপর বসালেন। বললেন-“আপনার বৈকুন্ঠে গমন করুন।’’

অপ্রত্যাশিতভাবে যমরাজের এরূপ আচরণ দেখে আমরা অত্যন্ত বিস্মিত হলাম। আমাদের তখন দেখতে ইচ্ছা হল যে কিভাবে যমপুরীতে পাপীদের শাস্তি ভোগ করতে হচ্ছে। তখন আমাদের কৌতূহল দেখে যমরাজ রথে চড়িয়ে নরককুণ্ডের জীবদের দেখতে পাঠালেন। সেই সব ভয়ংকর নরক আমরা দেখতে লাগলাম।

ব্রাহ্মণ শৌরি তখন বললেন-“আপনারা সেখানে পাপীদের যে সব দুর্দশা দেখলেন তা দশা করে বলুন।”

সুপ্রজ্ঞা দুঃখিত চিত্তে বলতে লাগলেন- সেখানে বিশাল একটি দুর্গম অতি দুঃখপ্রদ রাস্তা রয়েছে। সেই রাস্তায় কোথাও জ্বলন্ত আগুন, কোথাও উত্তপ্ত কাদা, কোথাও অন্ধকূপ, কোথাও কাঁটাময় গাছ, কোথাও কঙ্কালের স্তূপ, কোথাও ভয়ংকর জন্তুর গর্জন। সেই ক্লেশপূর্ণ পথ দিয়ে যমদূতেরা পাপীদের টেনে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। পাপীদের কাও গলায়, কারও কানেম কারও নাকে অঙ্কুশ দিয়ে প্রহার করা হচ্ছে, কারও কান ছিদ্র করে ভারী পাথর ঝুলিয়ে, কারও শিশ্নতে লোহা বেঁধে, ঘাড়ে ধাক্কা দিয়ে, কারও মাথা নিচু করে পা উপরে করে নিয়ে যাচ্ছে। সেইসব পাপীদের ধমক দিয়ে বলছেন-“তোমরা মূর্খ, আমাকে অগ্রাহ্য করে জগতে নানা দুরাচারে রত হয়েছ, তোমাদের পাপের উপযুক্ত দণ্ড এখন লাভ কর।” সারিবদ্ধ হয়ে পাপীরা দাঁড়িয়ে থাকে। চিত্রগুপ্ত প্রত্যেকের পাপকর্মের কথা বলতে থাকেন। মাঝে মাঝে পাপীরা অভিযোগ করে- “আমি এত পাপ করেছি কি করে বলছেন?” তখন যমরাজের আহ্বানে সূর্য, চন্দ্র, বায়ূ, আকাশ, পৃথিবী, জল, তিথি, দিবা, রাত্রি, ঊষা, সন্ধ্যা, ধর্ম-ইত্যাদি বহু সাক্ষী এসে পাপীদের পাপ কর্মের কথা স্মরণ করিয়ে দেন।

ভীষণরূপ যমদূতেরা পাপীদের বিচারের পর নরককুণ্ডের মধ্য নিয়ে যায়। কাউকে বিষ্ঠার গর্তে, কাউকে তপ্তকূপে, কাউকে কাঁটার গর্তে নিক্ষেপ করে। কেউ নিজ মাংস ভক্ষণ, কেউ মলমূত্র ভক্ষণ, কেউ শুক্র বা রক্তপান করতে থাকে। কাউকে পা বেঁধে মাথাটিকে পাথরের উপর আছাড় দেওয়া হয়। বঁড়শি কাঁটা দিয়ে কারও চোখ উৎপাটন করা হয়। কাউকে গাছের ডালে বেঁধে আগুন ধরানো হয়। কাউকে বিষাক্ত ধূমপান করানো হয়। কাউকে তপ্ত স্থানে শুইয়ে দিয়ে ভারী পাথর বুকের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। কাউকে উত্তপ্ত তেলের কড়াইতে ভাজা হয়, কাউকে বাঘ ভালুকের খাবার জন্য ঠেলে দেওয়া হয়। কাউকে কৃমি ভক্ষণ, দুর্গন্ধ মাংস ভক্ষণ করতে দেওয়া হয়। নাকের মধ্যে কাউকে কাপড় ঢুকিয়ে শ্বাসরোধ করা হয়।

এইভাবে তারা নরক ভোগ করে যন্ত্রণায় ‘ত্রাহি ত্রাহি’ করতে থাকে। দীর্ঘকাল ধরে ক্ষুধা তৃষ্ণায় কাতর হয়ে তারা সমস্ত পাপকর্মের ফল ভোগ করে। অবশেষে তাদের একটি পাপযোনিতে জন্মগ্রহণের জন্য পাঠানো হয়।

এইরূপে পাপীদের দুর্গতি পরিদর্শন করে আমরা দুজনে রথে চড়ে ভগবদ্ধামে গমন করলাম। কোটি কল্পকাল সেখানে পরম আনন্দে বাস করে অখিল সম্পদ ভোগ করলাম।

কিন্তু যে একাদশীর কৃপায় আমরা অপ্রত্যাশিতভাবে এমন সৌভাগ্য প্রাপ্ত হয়েছি, সেই একাদশীর মাহাত্ম্য জগতে প্রচার করতে আমাদের অভিলাষ হল। পরমেশ্বর ভগবান শ্রীবিষ্ণুর প্রেরণায় আমরা এই ধরাধামে রাজবংশে জন্মগ্রহণ করেছি। এই জন্মে একাদশী ব্রত আচরণ ও তার মাহাত্ম্য প্রচার করে সুখমৃত্যু লাভ করে শ্রীবৈকুন্ঠে গমন করব।

((সূত্র: একাদশী মাহাত্ম্য))

মহারাজ রুক্মাঙ্গদের কাহিনীঃ

প্রাচীনকালে কৌশিক নগরে রুক্মাঙ্গদ নামে এক রাজা ছিলেন। তিনি ছিলেন ভগদ্ভক্তিপরায়ণ। একাদশী ব্রত পালনে তার গভীর নিষ্ঠা ছিল। সমস্ত রাজ্যে তিনি ঘোষণা করতেন- আজ একাদশী তিথি। অতএব আট থেকে আশি বছর বয়স পর্যন্ত যে ব্যক্তি আমার বাজ্যে অন্ন ভোজন করবে তাকে হত্যা অথবা রাজ্য থেকে বিতাড়িত করা হবে। আমার আত্মীয়-স্বজনের মধ্যেও এই আদেশ বলবৎ থাকবে। পিতা-মাতা, পতি-পত্নী, পুত্র-কন্যা, বন্ধু-বান্ধব সকলকেই এই ব্রত পালন করতে হবে। অন্যথায় কঠোর দণ্ড প্রদান করা হবে। রাজার আদেশে রাজ্যবাসী সকলে একাদশী ব্রত পালন করে বৈকুন্ঠে যেতে লাগল। ধর্মরাজ যম একেবারে কর্মশূন্য হেয় পড়লেন। চিত্রগুপ্ত হিসাব-নিকাশের কাজ থেকে অবসার নিলেন।

একদিন দেবর্ষি নারদ যমপুরীতে উপস্থিত হয়ে যমরাজের সমস্ত দুঃখের কাহিনী শুনলেন। তারপর যমরাজ ও চিত্রগুপ্ত নারদের সঙ্গে সত্যলোকে গিয়ে ব্রহ্মার কাছে সকল বৃত্তান্ত জানালেন। ব্রহ্মা যমরাজের সম্মান রক্ষার্থে কিছুক্ষণ চিন্তা করলেন। পরে এক পরমা সুন্দরী নারী মূর্তি সৃষ্টি করলেন। এর নাম রাখলেন মোহিনী। তিনি বললেন- এখনই তুমি মন্দার পর্বতে গিয়ে রুক্মাঙ্গদ রাজাকে মোহিত করা।

ব্রহ্মাকে প্রণাম করে মোহিনী মন্দার পর্বতে উপস্থিত হল। সেখানে বসে সে অপূর্ব গান্ধার রাগে গান গাইতে লাগল। গানে আকৃষ্টি হয়ে দেব-দৈত্য ও অন্যান্য সকল প্রাণী সেখানে আসতে শুরু করল।

এদিকে রাজার রুক্মাঙ্গদ তাঁর উপযুক্ত পুত্রের উপর রাজ্যভার অর্পণ করে মৃগ শিকারের উদ্দেশ্যে বনে গমন করেন। (হিংস্র প্রাণী বধ ও শত্রু থেকে প্রজাকে রক্ষার অভ্যাসের জন্য পূর্বে রাজারা মৃগয়ায় যেতেন।) বনে গমন করে তিনি বামদেব মুনির আশ্রমে উপনীত হন। মুনির কাছে জানতে পারলেন যে, তিনি পূর্বজন্মে শুদ্র ছিলেন এবং তার দুষ্টা স্ত্রী ছিল, যার ফলে তাকে দারিদ্র দশা ভোগ করতে হয়েছে। কিন্তু ঐ জন্মে একাদশী ব্রত পালনের জন্য এখন এই সমস্ত বৈভব প্রাপ্তি হয়েছে।

মুনির অনুমতি নিয়ে রাজা মন্দার পর্বত অভিমুখে যাত্রা করলেন। সেখানে পৌঁছে দেখতে পেলেন অদ্ভুত এক সঙ্গীতের শব্দে আকৃষ্ট হয়ে পশু-পাখিরা একদিকে ছুটে যাচ্ছে। কৌতূহলবশত রাজাও কিছু সময়ের মধ্যে সেখানে উপস্থিত হলেন। তপ্তকাঞ্চনবর্ণা পরমা সুন্দরী মোহিনীকে সেখানে দেখতে পেলেন। তাঁকে পত্নীরূপে লাভের বাসনার কথা ব্যক্ত করলেন। মোহিনী বলল-আমি ব্রহ্মার কন্যা, আপনার কীর্তি শ্রবণ করে আপনাকে পতীরূপে লাভের জন্য সঙ্গীতের মাধ্যমে শঙ্করের উপাসনা করছি। এখনই তিনি সেই ফল দান করলেন।

রাজা প্রতিজ্ঞা করে বললেন, ‘মোহিনী তুমি যা ইচ্ছা করবে তাই আমি পূরণ করব’। তারপর মোহিনীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি রাজধানীতে ফিলে এলেন।

এভাবে মোহিনীর সঙ্গে বিলাসিতায় আট বছর অতিবাহিত হল। পরের বছর কার্তিক মাস উপস্থিত হলে রাজা মোহিনীকে বললেন- ‘মোহিনী তোমার সাথে ভোগ-বিলাসে বহুদিন অতিবাহিত করেছি। এবার তোমার মোহ পরিত্যাগ করে কার্তিক ব্রত পালন করতে ইচ্ছা করছি। তুমি আমার অনুমতি দাও’।

এতদিন দিন সুখবিলাসে মত্ত থাকলেও রাজা কখনও একাদশী ব্রত পালনে অবহেলা করেন নি। মোহিনী বলল-হে মহারাজ! আপনাকে পরিত্যাগ করে আমি ক্ষণকাল থাকতে পারি না। অতএব ব্রতের পরিবর্তে ব্রাহ্মণদের ভোজন-দ্রব্যাদি দান করুন এবং আপনার জ্যেষ্ঠাপত্নী সন্ধ্যাবলীই কার্তিক ব্রত পালন করুক।

এইরূপ কথোপকথন চলার সময় পুত্র ধর্মাঙ্গদের একাদশী দিনের ঘোষণা বাদ্য রাজা শুনতে পেলেন। পিতা অবসর-প্রাপ্ত হওয়ায় পুত্র ধর্মাঙ্গদই রাজ্য পরিচালনা করতেন। আগামীকাল একাদশী। তাই বাদ্যদ্বারা প্রজাদের সে কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। তা শুনে রাজা মোহিনীকে বললেন, মোহিনী! তোমার আজ্ঞায় কার্তিক ব্রত পালনে সন্ধ্যাবলীকে নিযুক্ত করেছি, কিন্তু একাদশী ব্রত আমি নিজে করব। তুমিও আমার সাথে সংযতভাবে এই ব্রত পালন কর।

মোহিনী রাজার কথা শুনে বলল-হে রাজন! একাদশী পালন অবশ্য কর্তব্য। কিন্তু আপনি আমার কাছে শপথ করেছেন আমি যা বলব আপনি তা অবশ্যই পালন করবেন। রাজা বললেন- তোমার ইচ্ছা আমি পূরণ করব। মোহিনী বলল- তাহলে আমার ইচ্ছা আপনি একাদশী ব্রত না করে অন্ন ভোজন করুন। যদি আমার কথা রক্ষা না করেন, তবে প্রতিজ্ঞা ভঙ্গজনিত পাপে ঘোর নরকে পতিত হবেন।

রাজা পুনরায় বললেন- কল্যাণী, আমার ব্রত ভঙ্গ করো না। পরিবর্তে তুমি অন্য যা কিছু চাইবে আমি তা প্রদান করব। একাদশীতে কেউ অন্ন ভোজ করবে না-একথা আমি নিজেই প্রচার করে কিভাবে তার বিপরীত আচরণ করব? যদি ইন্দ্রের তেজ ক্ষীণ হয়, সমুদ্র শুকয়ে যায়, অগ্নি তার উষ্ণতা ত্যাগ করে তথাপি রাজা রুক্মাঙ্গদ একাদশী ব্রত ভঙ্গ করবে না।

একথা শুনে মোহিনী ক্রোধে জ্বলে উঠল। ‘হে রাজন, আমার কথা না মানলে তুমি ধর্মভ্রষ্ট হবে, আমিও পিতার কাছে চলে যাব’-এই বলে মোহিনী গমনোদ্যত হল। রাজপুত্র ধর্মঙ্গদ এসে তার গতি রোধ করল। মাতা মোহিনীর কাছে সমস্ত ঘটনা শ্রবণ করল। উত্তেজিত হয়ে রাজা রুক্মাঙ্গদ বললেন- মোহিনী মরে যায় যাক, তবু আমি একাদশী ব্রত থেকে বিরত হব না।

ধর্মাঙ্গদ নিজমাতা সন্ধ্যাবলীকে ডেকে এনে মোহিনীকে সান্ত্বনা দিতে অনুরোধ করল। সন্ধ্যাবলীর মথ অনুরোধেও মোহিনী শান্ত হল না। সে বলল-রাজা যদি একাদশীতে ভোজন না করেন তবে তার পরিবর্তে নিজ প্রিয় পুত্রের মস্তক ছেদন করে আমাকে প্রদান করুন। মোহিনীর কথা শুনে সন্ধ্যাবলী বললেন- মহরাজ ধর্মহানি থেকে পুত্রের প্রাণনাশ করাই শ্রেয়। পিতার থেকে মাতার স্নেহ শতগুণ বেশি। কিন্তু আজ মাতা হয়েও স্বামীর প্রতিজ্ঞা ভঙ্গের ধর্মহানির আশঙ্কায় ও সত্য পালনের জন্য পুত্রের মমতা ত্যাগ করছি। আপনি স্নেহমমতা ত্যাগ করে পুত্রকে বধ করুন। সেই সময় রাজপুত্র ধর্মাঙ্গদ মোহিনীর সমানে দাঁড়িয়ে বললেন-‘তুমি আমার বধরূপ বর গ্রহণ কর’। একটি তীক্ষ্ণ তরবারি তুলে দিয়ে বললেন- হে পিতা! আপনি বিলম্ব করবেন না, মোহিনীর কাছে যে পতিজ্ঞা করেছেন তা পালন করুন, আপনার মঙ্গলের জন্য আমার মৃত্যুই শ্রেয়।

তখন মোহিনী রাজা রুক্মঙ্গদকে পুনরায় বলল-‘একাদশীতে ভোজন কর, পুত্রবধ করতে হবে না, তা না হলে পুত্রবধ করতে হবে’।

সেই সময় অলক্ষিতভাবে ভগবান বিষ্ণু আকাশে আবির্ভূত হলেন। রাজা আনন্দে প্রণাম করে তরবারি গ্রহণ করলেন। পুত্রাও আনন্দে ভূতলে মস্তক স্থাপন করলেন। রাজা তরবারি দিয়ে পুত্রকে বধ করতে উদ্যত হলে পর্বতসহ সমগ্র পৃথিবী কেঁপে উঠল, সমুদ্রে জোয়ার এল, পৃথিবীতে উল্কাপাত হতে লাগল। তা দেখে মোহিনী মূর্ছিত হয়ে পড়ল। তখন ভগবান শ্রীহরি নিজের হাতে সেই তরবারি ধারণ করে বললেন-‘হে রাজন! আমি তোমার প্রতি বিশেষ প্রসন্ন হয়েছি, তুমি স্ত্রী-পুত্রসহ বৈকুন্ঠধামে চল’। এই বলে ভগবান অন্তর্হিত হলেন।

তাই মানজীবনে যে কোন পরিস্থিতিতেও কি বালক, কি বৃদ্ধ, স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলেরই একাদশী ব্রত পালন করা অবশ্য কর্তব্য।

((সূত্র: একাদশী মাহাত্ম্য))

 

 “ধন্যবাদ 

= বাংলা হাউ ডট কম =

((www.banglahow.com))

“জয় রাধেশ্যাম”