শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতার তৃতীয় অধ্যায়ের বাংলা সরলার্থ (কর্মযোগ)

শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতার তৃতীয় অধ্যায়

শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতা হল পরমেশ্বর ভগবানের মুখনিঃসৃত বাণী। এ গীতা হল সকল গ্রন্থের সার-স্বরূপ। শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতা সংস্কৃত ভাষায় রচিত । তাই বাঙ্গালী বা বাংলা ভাষা-ভাষীদের জন্য গীতার মর্মাথ উপলব্ধি করার সহায়ক হিসাবে শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতার তৃতীয় অধ্যায়ের সংস্কৃত শ্লোকের বাংলা অর্থ সহ বাঙ্গানুবাদ দেয়া হল। এ বঙ্গানুবাদ স্বনামধন্য তিনজন অনুবাদকের শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতা গ্রন্থের বাংলা অর্থ একসাথে বর্ণিত হল।

অথ তৃতীয়োহধ্যায়ঃ

কর্মযোগ

অর্জুন উবাচ

জ্যায়সী চেৎ কর্মণস্তে মতা বুদ্ধির্জনার্দন।

তৎ কিং কর্মণি ঘোরে মাং নিয়োজয়সি কেশব।।১

অনুবাদঃ অর্জুন বললেন- হে জনার্দন! হে কেশব! যদি তোমার মতে কর্ম অপেক্ষা ভক্তি-বিষয়িনী বুদ্ধি শ্রেয়তর হয়, তা হলে এই ভয়ানক যুদ্ধে নিযুক্ত হওয়ার জন্য কেন আমাকে প্ররোচিত করছ?- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-১)

অর্জুন উবাচ

জ্যায়সী চেৎ কর্মণস্তে মতা বুদ্ধির্জনার্দন।

তৎ কিং কর্মণি ঘোরে মাং নিয়োজয়সি কেশব।।১

ব্যামিশ্রেণেব বাক্যেন বুদ্ধিং মোহয়সীব মে।

তদেকং বদ নিশ্চিত্য যেন শ্রেয়োহহমাপ্নুয়াম্‌।।২

সরলার্থঃ অর্জুন বলিলেন, হে জনার্দন, যদি তোমার মতে কর্ম হইতে বুদ্ধি শ্রেষ্ঠ, তবে হে কেশব, আমাকে হিংসাত্মক কর্মে কেন নিযুক্ত করিতেছ? বিমিশ্রবাক্যদ্বারা কেন আমার মকে মোহিত করিতেছ? যাহা দ্বারা আমি শ্রেয় লাভ করিতে পারি, সেই একটি (পথ) আমাকে নিশ্চিত করিয়া বল। – (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-১-২)

বাংলা অর্থঃ অর্জুন বললেন, হে জনার্দন! যদি আপনি কর্ম থেকে বুদ্ধিকে (জ্ঞান) শ্রেষ্ঠ বলে মনে করেন, তাহলে হে কেশব! আমাকে এই ঘোর কর্মে কেন নিযুক্ত করছেন? আপনি আপনার এই বিমিশ্র বচন দ্বারা কেন আমার বুদ্ধিকে মোহিত করছেন? সুতরাং আপনি নিশ্চিত করে আমায় এমন কথা বলুন যার দ্বারা আমি কল্যাণ লাভ করতে সক্ষম হই।– (স্বামী রামসুখদাস-১-২)

ব্যামিশ্রেণেব বাক্যেন বুদ্ধিং মোহয়সীব মে।

তদেকং বদ নিশ্চিত্য যেন শ্রেয়োহহমাপ্নুয়াম্‌।।২

অনুবাদঃ তুমি যেন দ্ব্যর্থবোধক বাক্যের দ্বারা আমার বুদ্ধি বিভ্রান্ত করছ। তাই, দয়া করে আমাকে নিশ্চিতভাবে বল কোনটি আমার পক্ষে সবচেয়ে শ্রেয়স্কর।- (যথাযথ-২)

শ্রীভগবান উবাচ

লোকেহস্মিন্‌ দ্বিবিধা নিষ্ঠা পুরা প্রোক্তা ময়ানঘ।

জ্ঞানযোগেন সাংখ্যানাং কর্মযোগেন যোগিনাম্‌।।৩

সরলার্থঃ হে অনঘ, ইহালোক দ্বিবিধা নিষ্ঠা আছে ইহা পূর্বে বলিয়াছি। সাংখ্যদিগের জন্য জ্ঞানযোগ এবং কর্মীদিগের জন্য কর্মযোগ। – (জগদীশ গীতা-৩)

অনুবাদঃ পরমেশ্বর ভগবান বললেন- হে নিষ্পাপ অর্জুন! আমি ইতিপূর্বে ব্যাখ্যা করেছি যে, দুই প্রকার মানুষ আত্ম-উপলব্ধি করতে চেষ্টা করে। কিছু লোক অভিজ্ঞতালব্ধ দার্শনিক জ্ঞানের আলোচনার মাধ্যমে নিজেকে জানতে চান এবং অন্যেরা আবার তা ভক্তির মাধ্যমে জানতে চান।- (যথাযথ-৩)

বাংলা অর্থঃ শ্রীভগবান বললেন-হে অনঘ অর্জুন! এই মনুষ্যলোকে দুই প্রকারের নিষ্ঠা আছে, একথা আমি আগেই বলেছি। সেগুলি হল জ্ঞানীদের নিষ্ঠা জ্ঞানযোগের দ্বারা এবং যোগীদের নিষ্ঠা কর্মযোগের দ্বারা ঘটে।– (রামসুখদাস-৩)

ন কর্মণামনারম্ভান্নৈঙ্কর্মং পুরুষোহশ্নুতে।

ন চ সন্ন্যসনাদেব সিদ্ধিং সমধিগচ্ছতি।।৪

সরলার্থঃ কর্মচেষ্টা না করিলেই পুরুষ নৈষ্কর্ম্যলাভ করিতে পারে না, আর (কামনাত্যাগ ব্যতীত) কর্মত্যাগ করিলেই সিদ্ধি লাভ হয় না। – (জগদীশ গীতা-৪)

অনুবাদঃ কেবল কর্মের অনুষ্ঠান না করার মাধ্যমে কর্মফল থেকে মুক্ত হওয়া যায় না, আবার কর্মত্যাগের মাধ্যমেও সিদ্ধি লাভ করা যায় না।- (যথাযথ-৪)

বাংলা অর্থঃ মানুষ কর্মচেষ্টা না করলেই যে নৈষ্কর্ম্যপ্রাপ্ত হয় তা নয়, আর কর্মত্যাগ করলেই যে সিদ্ধি লাভ হয় তাও নয়।– (রামসুখদাস-৪)

ন হি কশ্চিৎ ক্ষণমপি জাতু তিষ্ঠত্যকর্মকৃৎ।

কার্যতে হ্যবশঃ কর্ম সর্বঃ প্রকৃতিজৈর্গুণৈঃ।।৫

সরলার্থঃ কেহই কখনও ক্ষণকালও কর্ম না করিয়া থাকিতে পারে না, কেননা, প্রকৃতির গুণে অবশ হইয়া সকলেই কর্ম করিতে বাধ্য হয়। – (জগদীশ গীতা-৫)

অনুবাদঃ সকলেই মায়াজাত গুণসমূহের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে অসহায়ভাবে কর্ম করতে বাধ্য হয়; তাই কর্ম না করে কেউই ক্ষণকালও থাকতে পারে না।- (যথাযথ-৫)

বাংলা অর্থঃ কোনো ব্যক্তিই কোনো অবস্থায় ক্ষণকালও কর্ম না করে থাকতে পারে না, কেননা প্রকৃতিজাত গুণে বশীভূত প্রাণী কর্ম করতে বাধ্য হয়।– (রামসুখদাস-৫)

কর্মেন্দ্রিয়াণি সংযম্য য আস্তে মনসা স্মরন্‌।

ইন্দ্রিয়ার্থান্‌ বিমূঢ়াত্মা মিথ্যাচারঃ স উচ্যতে।।৬

সরলার্থঃ যে ভ্রান্তমতি হস্তপদাদি কর্মেন্দ্রিয়সকল সংযত করিয়া অবস্থিতি করে, অথচ মনে মনে ইন্দ্রিয়-বিষয়সকল স্মরণ করে, সে মিথ্যাচারী। – (জগদীশ গীতা-৬)

অনুবাদঃ যে ব্যক্তি পঞ্চ-কর্মেন্দ্রিয় সংযত করেও মনে মনে শব্দ, রস আদি ইন্দ্রিয় বিষয়গুলি স্মরণ করে, সেই মূঢ় অবশ্যই নিজেকে বিভ্রান্ত করে এবং তাকে মিথ্যাচারী ভণ্ড বলা হয়ে থাকে।- (যথাযথ-৬)

বাংলা অর্থঃ যে কর্মেন্দ্রিয়গুলিকে (সব ইন্দ্রিয়গুলিকে) হঠতাপূর্বক রুদ্ধ করে মন দ্বারা ইন্দ্রিয়গুলির বিষয় চিন্তা করতে থাকে, সেই মূঢ়মতি ব্যক্তিকে মিথ্যাচারী (মিথ্যা আচারণকারী) বলা হয়।– (রামসুখদাস-৬)

যস্ত্বিন্দ্রিয়াণি মনসা নিয়ম্যারবতেহর্জুন।

কর্মেন্দ্রিয়ৈঃ কর্মযোগমসক্তঃ স বিশিষ্যতে।।৭

সরলার্থঃ কিন্তু যিনি মনের দ্বারা জ্ঞানেন্দ্রিয়সকল সংযত করিয়া অনাসক্ত হইয়া কর্মেন্দ্রিয়ের দ্বারা কর্মযোগের অনুষ্ঠান আরম্ভ করেন, তিনি শ্রেষ্ঠ। – (জগদীশ গীতা-৭)

অনুবাদঃ কিন্তু যিনি মনের দ্বারা ইন্দ্রিয়গুলিকে সংযত করে অনাসক্তভাবে কর্মযোগের অনুষ্ঠান করেন, তিনি পূর্বোক্ত মিথ্যাচারী অপেক্ষা অনেক গুণে শ্রেষ্ঠ।- (যথাযথ-৭)

বাংলা অর্থঃ হে অর্জুন! যে ব্যক্তি মনের দ্বারা ইন্দ্রিয়গুলি সংযত করে অনাসক্ত হয়ে (নিষ্কামভাবে) কর্মেন্দ্রিয়ের সাহায্যে কর্মযোগ অনুষ্ঠান করেন, তিনিই শ্রেষ্ঠ।– (রামসুখদাস-৭)

নিয়তং কুরু কর্ম ত্বং কর্ম জ্যায়ো হ্যকর্মণ।

শরীরযাত্রাপি চ তে ন প্রসিধ্যেদকর্মণঃ।।৮

সরলার্থঃ তুমি নিয়ত কর্ম কর; কর্মশূন্যতা অপেক্ষা কর্ম শ্রেষ্ঠ, কর্ম না করিলে তোমার দেহযাত্রাও নির্বাহ হইতে পারে না।- (জগদীশ গীতা-৮)

অনুবাদঃ তুমি শাস্ত্রোক্ত কর্মের অনুষ্ঠান কর, কেন না কর্মত্যাগ থেকে কর্মের অনুষ্ঠান শ্রেয়। কর্ম না করে কেউ দেহযাত্রাও নির্বাহ করতে পারে না।- (যথাযথ-৮)

বাংলা অর্থঃ তুমি শাস্ত্রবিধিসম্মত (নির্দিষ্ট) কর্ম করো, কারণ কর্ম না করার থেকে কর্ম করা শ্রেষ্ঠ, কর্ম না করলে তোমার শরীর নির্বাহও হতে পারে না।– (রামসুখদাস-৮)

যজ্ঞার্থাৎ কর্মণোহন্যত্র লোকোহয়ং কর্মবন্ধনঃ।

তদর্থং কর্ম কৌন্তেয় মুক্তসঙ্গঃ সমাচর।।৯

সরলার্থঃ যজ্ঞার্থ যে কর্ম তদ্ভিন্ন অন্য কর্ম মনুষ্যের বন্ধনের কারণ। হে কৌন্তেয়, তুমি সেই উদ্দেশ্যে (যজ্ঞার্থ) অনাসক্ত হইয়া কর্ম কর। – (জগদীশ গীতা-৯)

অনুবাদঃ বিষ্ণুর প্রীতি সম্পাদন করার জন্য কর্ম করা উচিত; তা না হলে কর্মই এই জড় জগতে বন্ধনের কারণ। তাই, হে কৌন্তেয়! ভগবানের সন্তুষ্টি বিধানের জন্যই কেবল তুমি তোমার কর্তব্যকর্ম অনুষ্ঠান কর এবং এভাবেই তুমি সর্বদাই বন্ধন থেকে মুক্ত থাকতে পারবে।- (যথাযথ-৯)

বাংলা অর্থঃ যজ্ঞের (কর্মব্য পালনের) উদ্দেশ্যে করা কর্মগুলি ব্যতিরেকে অন্য কর্ম (নিজের জন্য করা কর্ম) করলে মানুষ তাতে আবদ্ধ হয়, সেইজন্য হে কুন্তীনন্দন! তুমি আসক্তিবর্জিত হয়ে যজ্ঞের উদ্দেশ্যেই কর্তক্যকর্ম করো।– (রামসুখদাস-৯)

সহযজ্ঞাঃ প্রজাঃ সৃষ্ট্বা পুরোবাচ প্রজাপতিঃ।

অনেন প্রসবিষ্যধ্বমেষ বোহস্ত্বিষ্টকামধুক্‌।।১০

সরলার্থঃ সৃষ্টির প্রারম্ভে প্রজাপতি যজ্ঞের সহিত প্রজা সৃষ্টি করিয়া বলিয়াছিলেন- তোমার এই যজ্ঞদ্বারা উত্তরোত্তর বর্ধিত হও; এই যজ্ঞ তোমাদের অভীষ্টপ্রদ হউক। – (জগদীশ গীতা-১০)

অনুবাদঃ সৃষ্টির প্রারম্ভে সৃষ্টিকর্তা যজ্ঞাদি সহ প্রজাসকল সৃষ্টি করে বলেছিলেন-“এই যজ্ঞের দ্বারা তোমরা উত্তরোত্তর সমৃদ্ধ হও। এই যজ্ঞ তোমাদের সমস্ত অভীষ্ট পূর্ণ করবে”।- (যথাযথ-১০)

দেবান্‌ ভাবয়তানেন তে দেবা ভাবয়ন্তু বঃ।

পরস্পরং ভাবয়ন্তঃ শ্রেয়ঃ পরমবাপ্স্যথ।।১১

সরলার্থঃ এই যজ্ঞদ্বারা তোমরা দেবগণকে (ঘৃতাহুতি প্রদানে) সংবর্ধনা কর, সেই দেবগণও (বৃষ্ট্যাদি দ্বারা) তোমাদিগকে সংবর্ধিত করুন; এইরূপে পরস্পরের সংবর্ধনা দ্বারা পরম মঙ্গল লাভ করিবে। – (জগদীশ গীতা-১১)

অনুবাদঃ তোমাদের যজ্ঞ অনুষ্ঠানে প্রীত হয়ে দেবতারা তোমাদের প্রীতি সাধন করবেন। এভাবেই পরস্পরের প্রীতি সম্পাদন করার মাধ্যমে তোমরা পরম মঙ্গল লাভ করবে।- (যথাযথ-১১)

সহযজ্ঞাঃ প্রজাঃ সৃষ্ট্বা পুরোবাচ প্রজাপতিঃ।

অনেন প্রসবিষ্যধ্বমেষ বোহস্ত্বিষ্টকামধুক্‌।।১০

দেবান্‌ ভাবয়তানেন তে দেবা ভাবয়ন্তু বঃ।

পরস্পরং ভাবয়ন্তঃ শ্রেয়ঃ পরমবাপ্স্যথ।।১১

বাংলা অর্থঃ প্রজাপতি ব্রহ্মা সৃষ্টির আরম্ভে কর্তব্যকর্মের বিধানসহ প্রজা (মানুষ প্রমুখ) সৃষ্টি করে তাদের (প্রধানত মানুষকে) বলেছিলেন যে, তোমরা এই কর্তব্য (যজ্ঞ) দ্বারা সকলের সমৃদ্ধি করো এবং এই কর্তব্যরূপ যজ্ঞ তোমাদের কর্তব্য পালনের অভীষ্ট সামগ্রী প্রদানকারী হোক। এই কর্তব্যকর্ম (যজ্ঞ) দ্বরা তোমরা দেবতাগণের সংবর্ধন করো এবং দেবতাগণও তাঁদের কর্তব্য দ্বারা তোমাদের মানোন্নয়ন (সংবর্ধন) করুন। এইভাবে পরস্পরের সংবর্ধনার দ্বারা তোমরা পরম কল্যাণ প্রাপ্ত হবে।– (রামসুখদাস-১০-১১)

ইষ্টান্‌ ভোগান্‌ হি বো দেবাঃ দাস্যন্তে যজ্ঞভাবিতাঃ।

তৈর্দত্তানপ্রদায়ৈভ্যো যো ভুঙ্‌ক্তে স্তেন এব সঃ।।১২

সরলার্থঃ যেহেতু, দেবগণ যজ্ঞাদিদ্বারা সংবর্ধিত হইয়া তোমাদিগকে অভীষ্ট ভোগ্যবস্তু প্রদান করেন, সুতরাং তাঁহাদিগের প্রদত্ত অন্নপানাদি যজ্ঞাদি দ্বারা তাহাদিগকে প্রদান না করিয়া যে ভোগ করে সে নিশ্চয়ই চোর (দেবস্বাপহারী)। – (জগদীশ গীতা-১২)

অনুবাদঃ যজ্ঞের ফলে সন্তুষ্ট হয়ে দেবতারা তোমাদের বাঞ্ছিত ভোগ্যবস্তু প্রদান করবেন। কিন্তু দেবতাদের প্রদত্ত বস্তু তাঁদের নিবেদন না করে যে ভোগ করে, সে নিশ্চয়ই চোর।- (যথাযথ-১২)

বাংলা অর্থঃ যজ্ঞ দ্বারা পুষ্ট (সংবর্ধিত) দেবগণ তোমাদের (বিনা প্রার্থনাতেই) কর্তব্যকর্মের জন্য আবশ্যক সামগ্রী প্রদান করে যাবেন। দেবতা প্রদত্ত এই সামগ্রী অন্যের সেবায় ব্যয় না করে যে ব্যক্তি স্বয়ং ভোগ করে, সে অবশ্যই চোর।– (রামসুখদাস-১২)

যজ্ঞশিষ্টাশিনঃ সন্তো মুচ্যন্তে সর্বকিল্বিষৈঃ।

ভুঞ্জতে তে ত্বঘং পাপা যে পচন্ত্যাত্মকারণাৎ।।১৩

সরলার্থঃ যে সজ্জনগণ যজ্ঞাবশেষ অন্ন ভোজন করেন অর্থাৎ দেবতা অতিথি প্রভৃতিকে অন্নাদি প্রদান করিয়া অবশিষ্ট ভোজন করেন, তাঁহারা সর্বপাপ হইতে মুক্ত হন। যে পাপাত্মারা কেবল আপন উদরপূরণার্থ অন্ন পাক করে, তাহারা পাপরাশিই ভোজন করে। – (জগদীশ গীতা-১৩)

অনুবাদঃ ভগবদ্ভক্তেরা সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত হন, কারণ তাঁরা যজ্ঞাবশিষ্ট অন্নাদি গ্রহণ করেন। যারা কেবল স্বার্থপর হয়ে নিজেদের ইন্দ্রিয়ের তৃপ্তির জন্য অন্নাদি পাক করে, তারা কেবল পাপই ভোজন করে।- (যথাযথ-১৩)

বাংলা অর্থঃ যজ্ঞাবশেষ (যোগ) অনুভবকারী শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিগণ সর্বপাপ থেকে মুক্ত হন। কিন্তু যারা সমস্ত কর্ম কেবল নিজের জন্যই করে সেইসকল পাপী ব্যক্তি শুধু পাপরাশিই ভক্ষণ করে থাকে।– (রামসুখদাস-১৩)

অন্নাদ্‌ভন্তি ভূতানি পর্জন্যাদন্নসম্ভবঃ।

যজ্ঞাদ্‌ভতি পর্জন্যো যজ্ঞঃ কর্মসমুদ্ভবঃ।।১৪

অনুবাদঃ অন্ন খেয়ে প্রাণীগণ জীবন ধারণ করে। বৃষ্টি হওয়ার ফলে অন্ন উৎপান্ন হয়। যজ্ঞ অনুষ্ঠান করার ফলে বৃষ্টি উৎপন্ন হয় এবং শাস্ত্রোক্ত কর্ম থেকে যজ্ঞ উৎপন্ন হয়।- (যথাযথ-১৪)

কর্ম ব্রহ্মোদ্ভবং বিদ্ধি ব্রহ্মাক্ষরসমুদ্ভবম্‌।

তস্মাৎ সর্বগতং ব্রহ্ম নিত্যং যজ্ঞে প্রতিষ্ঠিতম্‌।।১৫

অনুবাদঃ যজ্ঞাদি কর্ম বেদ থেকে উদ্ভূত হয়েছে এবং বেদ অক্ষর বা পরমেশ্বর ভগবান থেকে প্রকাশিত হয়েছে। অতএব বর্সব্যাপক ব্রহ্ম সর্বদা যজ্ঞে প্রতিষ্ঠিত আছেন।- (যথাযথ-১৫)

অন্নাদ্‌ভন্তি ভূতানি পর্জন্যাদন্নসম্ভবঃ।

যজ্ঞাদ্‌ভতি পর্জন্যো যজ্ঞঃ কর্মসমুদ্ভবঃ।।১৪

কর্ম ব্রহ্মোদ্ভবং বিদ্ধি ব্রহ্মাক্ষরসমুদ্ভবম্‌।

তস্মাৎ সর্বগতং ব্রহ্ম নিত্যং যজ্ঞে প্রতিষ্ঠিতম্‌।।১৫

বাংলা অর্থঃ সমস্ত প্রাণী অন্ন থেকে উৎপন্ন হয়, অন্ন উৎপন্ন হয় মেঘ (জল) থেকে, মেঘ জন্নায় যজ্ঞ থেকে, যজ্ঞ নিষ্পন্ন হয় কর্ম থেকে। বেদ থেকে কর্ম উৎপন্ন হয় এবং বেদ পরব্রহ্ম থেকে প্রকটিত বলে জানবে। সেইহেতু এই সর্বব্যপিী পরমাত্মা যজ্ঞে (কর্তব্যকর্মে) নিত্য প্রতিষ্ঠিত।– (রামসুখদাস-১৪)

অন্নাদ্‌ভন্তি ভূতানি পর্জন্যাদন্নসম্ভবঃ।

যজ্ঞাদ্‌ভতি পর্জন্যো যজ্ঞঃ কর্মসমুদ্ভবঃ।।১৪

কর্ম ব্রহ্মোদ্ভবং বিদ্ধি ব্রহ্মাক্ষরসমুদ্ভবম্‌।

তস্মাৎ সর্বগতং ব্রহ্ম নিত্যং যজ্ঞে প্রতিষ্ঠিতম্‌।।১৫

এবং প্রবর্তিতং চক্রং নানুবর্তয়তীহ যঃ।

অঘায়ুরিন্দ্রিয়ারামো মোঘং পার্থ স জীবতি।।১৬

সরলার্থঃ প্রাণিসকল অন্ন হইতে উৎপন্ন হয়, মেঘ হইতে অন্ন জন্মে, যজ্ঞ হইতে মেঘ জন্মে, কর্ম হইতে যজ্ঞের উৎপত্তি, কর্ম বেদ হইতে উৎপন্ন জানিও এবং বেদ পরব্রহ্ম হইতে সমুদ্ভূত; সেই হেতু সর্বব্যাপী পরব্রহ্ম সদা যজ্ঞে প্রতিষ্ঠিত আছেন। এইরূপে প্রবর্তিত জগচ্চক্রের যে অনুবর্তন না করে (অর্থাৎ যে যজ্ঞাদি কর্মদ্বারা এই সংসার-চক্র পরিচালনের সহায়তা না করে) সে ইন্দ্রিয়সুখাসক্ত ও পাপজীবন; হে পার্থ, সে বৃথা জীবন ধারণ করে। – (জগদীশ গীতা-১৪-১৬)

এবং প্রবর্তিতং চক্রং নানুবর্তয়তীহ যঃ।

অঘায়ুরিন্দ্রিয়ারামো মোঘং পার্থ স জীবতি।।১৬

অনুবাদঃ হে অর্জুন! যে ব্যক্তি এই জীবনে বেদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত যজ্ঞ অনুষ্ঠানের পন্থা অনুসরণ করে না, সেই ইন্দ্রিয়সুখ-পরায়ণ পাপী ব্যক্তি বৃথা জীবন ধারণ করে।- (যথাযথ-১৬)

বাংলা অর্থঃ হে পার্থ! যে ব্যক্তি ইহলোকে এই প্রকার পরম্পরা দ্বারা প্রচলিত সৃষ্টিচক্র অনুযায়ী চলে না, ইন্দ্রিয়সুখাসক্ত পাপাচারী সেই ব্যক্তি বৃথাই এই জগতে জীবনধারণ করে থাকে।– (রামসুখদাস-১৬)

যস্ত্বাত্মরতিরেব স্যাদাত্মতৃপ্তশ্চ মানবঃ।

আত্মন্যেব চ সন্তুষ্টস্তস্য কার্যং ন বিদ্যতে।।১৭

সরলার্থঃ কিন্তু যিনি কেবল আত্মাতেই প্রীতি, যিনি আত্মাতেই তৃপ্ত, যিনি কেবল আত্মাতেই সন্তুষ্ট থাকেন, তাঁহার নিজের কোন প্রকার কর্তব্য নাই। – (জগদীশ গীতা-১৭)

অনুবাদঃ কিন্তু যে ব্যক্তি আত্মাতেই প্রীত, আত্মাতেই তৃপ্ত এবং আত্মাতেই সন্তুষ্ট, তাঁর কোন কর্তব্যকর্ম নেই।- (যথাযথ-১৭)

বাংলা অর্থঃ কিন্তু যে ব্যক্তি নিজেতেই প্রীতি, নিজেতেই তৃপ্ত এবং নিজেতেই সন্তুষ্ট, তাঁর নিজের জন্য কোনো কর্তব্য থাকে না।– (রামসুখদাস-১৭)

নৈব তস্য কৃতেনার্থো নাকৃতেনেহ কশ্চন।

ন চাস্য সর্বভূতেষু কশ্চিদর্থব্যপাশ্রয়ঃ।।১৮

সরলার্থঃ যিনি আত্মারাম তাঁহার কর্মানুষ্ঠানে কোন প্রয়োজন নাই, কর্ম হইতে বিরত থাকারও কোন প্রয়োজন নাই। সর্বভূতের মধ্যে কাহারও আশ্রয়ে তাঁহার কোন প্রয়োজন নাই (তিনি কাহার ও আশ্রয়ে সিদ্ধকাম হইবার আবশ্যকতা রাখেন না)। – (জগদীশ গীতা-১৮)

অনুবাদঃ আত্মানন্দ অনুভবকারী ব্যক্তির এই জগতে ধর্ম অনুষ্ঠানের কোন প্রয়োজন নেই এবং এই প্রকার কর্ম না করারও কোন কারণ নেই। তাকে অন্য কোন প্রাণীর উপর নির্ভর করতেও হয় না।- (যথাযথ-১৮)

বাংলা অর্থঃ সেই (কর্মযোগে সিদ্ধ) মহাপুরুষের এই জগতে কর্মানুষ্ঠানের কোনো প্রয়োজন নেই বা কর্ম থেকে বিরত থাকারও কোনো প্রয়োজন নেই এবং প্রাণীগণের সঙ্গেও তাঁর কোনো প্রকার স্বার্থের সম্পর্ক থাকে না।– (রামসুখদাস-১৮)

তস্মাদসক্তঃ সততং কার্যং কর্ম সমাচর।

অসক্তো হ্যাচরন্‌ কর্ম পরমাপ্নোতি পুরুষঃ।।১৯

সরলার্থঃ অতএব তুমি আসক্তিশূন্য হইয়া সর্বদা কর্তব্যকর্ম সম্পাদন কর, কারণ অনাসক্ত হইয়া কর্মানুষ্ঠান করিলে পুরুষ পরমপদ (মোক্ষ) প্রাপ্ত হন। – (জগদীশ গীতা-১৯)

অনুবাদঃ অতএব, কর্মফলের প্রতি আসক্তি রহিত হয়ে কর্তব্যকর্ম সম্পাদন কর। অনাসক্ত হয়ে কর্ম করার ফলেই মানুষ পরতত্ত্বকে লাভ করতে পারে।- (যথাযথ-১৯)

বাংলা অর্থঃ অতএব তুমি সর্বদা আসক্তিশূন্য হয়ে যথাযথভাবে কর্তব্যকর্ম পালন করো। কারণ অনাসক্ত হয়ে কর্ম করলে মানুষ পরমাত্মাকে (মোক্ষ) লাভ করে।– (রামসুখদাস-১৯)

কর্মণৈব হি সংসিদ্ধিমাস্থিতা জনকাদয়ঃ।

লোকসংগ্রহমেবাপি সংপশ্যন্‌ কর্তুমর্হসি।।২০

সরলার্থঃ জনকাদি মহাত্মারা কর্মদ্বারাই সিদ্ধিলাভ করিয়াছেন। লোকরক্ষার দিকে দৃষ্টি রাখিয়াও তোমার কর্ম করা কর্তব্য। – (জগদীশ গীতা-২০)

অনুবাদঃ জনক আদি রাজারাও কর্ম দ্বারাই সংসিদ্ধি প্রাপ্ত হয়েছিলেন। অতএব, জনসাধারণকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য তোমার কর্ম করা উচিত।- (যথাযথ-২০)

বাংলা অর্থঃ রাজা জনকের মতো মহাত্মাগণ কর্ম দ্বারাই পরম সিদ্ধি লাভ করেছেন। তাই লোকসংগ্রহের দিকে দৃষ্টি রেখে তোমারও নিষ্কামভাবে কর্ম করা উচিত।– (রামসুখদাস-২০)

যদ্‌ যদাচরতি শ্রেষ্ঠস্তত্তদেবেতরো জনঃ।

স যৎ প্রমাণং কুরুতে লোকস্তদনুবর্ততে।।২১

সরলার্থঃ শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি যাহা যাহা আচরণ করেন, অপর সাধারণেও তাহাই করে। তিনি যাহা প্রামাণ্য বলিয়া বা কর্তব্য বলিয়া গ্রহণ করেন, সাধারণ লোকে তাহারই অনুবর্তন করে।- (জগদীশ গীতা-২১)

অনুবাদঃ শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি যেভাবে আচরণ করেন, সাধারণ মানুষেরা তার অনুকরণ করে। তিনি যা প্রমাণ বলে স্বীকার করেন, সমগ্র পৃথিবী তারই অনুসরণ করে।- (যথাযথ-২১)

বাংলা অর্থঃ শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি যা যা আচরণ করেন, অন্যান্য সাধারণ ব্যক্তিগণও তাই করে থাকে। তিনি যা কিছু প্রামাণ্য বলে ধরেন, সাধারণ মানুষেরা সেই অনুযায়ী আচরণ করে থাকে।– (রামসুখদাস-২১)

ন মে পার্থস্তি কর্তব্যং ত্রিষু লোকেষু কিঞ্চন।

নানবাপ্তমবাপ্তব্যং বর্ত এব চ কর্মণি।।২২

সরলার্থঃ হে পার্থ, ত্রিলোকে মধ্যে আমার করণীয় কিছু নাই, অপ্রাপ্ত বা প্রাপ্তব্য কিছু নাই, তথাপি আমি কর্মানুষ্ঠানেই ব্যাপৃত আছি।- (জগদীশ গীতা-২২)

অনুবাদঃ হে পার্থ! এই ত্রিজগতে আমার কিছুই কর্তব্য নেই। আমার অপ্রাপ্ত কিছু সেই এবং প্রাপ্তব্যও কিছু নেই। তবুও আমি কর্মে ব্যাপৃত আছি।- (যথাযথ-২২)

বাংলা অর্থঃ হে পার্থ! ত্রিলোকে আমার কোনো কর্তব্য নেই এবং প্রাপ্ত করার যোগ্য কোনো বস্তুই অপ্রাপ্ত নেই, তবুও আমি কর্তব্যকর্মেই ব্যাপৃত আছি।– (রামসুখদাস-২২

যদি হ্যহং ন বর্তেয়ং জাতু কর্মণ্যতন্দ্রিতঃ।

মম বর্ত্মানুবর্তন্তে মনুষ্যাঃ পার্থ সর্বশঃ।।২৩

সরলার্থঃ হে পার্থ, যদি অনলস হইয়া কর্মানুষ্ঠান না করি, তবে মানবগণ সর্বপ্রকারে আমার পথের অনুবর্তী হইবে (কেহই কর্ম করিবে) না।- (জগদীশ গীতা-২৩)

অনুবাদঃ হে পার্থ! আমি যদি অনলস হয়ে কর্তব্যকর্মে প্রবৃত্ত না হই, তবে আমার অনুবর্তী হয়ে সমস্ত মানুষই কর্ম ত্যাগ করবে।- (যথাযথ-২৩)

উৎসীদেয়ুরিমে লোকা না কুর্যাং কর্ম চেদহম্‌।

সঙ্করস্য চ কর্তা স্যামুপহন্যামিমাঃ প্রজাঃ।।২৪

সরলার্থঃ যদি আমি কর্ম না করি তাহা হইলে এই লোকসকল উৎসন্ন হইয়া যাইবে। আমি বর্ণ-সঙ্করাদি সামাজিক বিশৃঙ্খলার হেতু হইব এবং ধর্মলোপহেতু প্রজাগণের বিনাশের কারণ হইব।- (জগদীশ গীতা-২৪)

অনুবাদঃ আমি যদি কর্ম না করি, তা হলে এই সমস্ত লোক উৎসন্ন হবে। আমি বর্ণসঙ্কর সৃষ্টির কারণ হব এবং ফলে আমার দ্বারা সমস্ত প্রজা বিনষ্ট হবে।- (যথাযথ-২৪)

যদি হ্যহং ন বর্তেয়ং জাতু কর্মণ্যতন্দ্রিতঃ।

মম বর্ত্মানুবর্তন্তে মনুষ্যাঃ পার্থ সর্বশঃ।।২৩

উৎসীদেয়ুরিমে লোকা না কুর্যাং কর্ম চেদহম্‌।

সঙ্করস্য চ কর্তা স্যামুপহন্যামিমাঃ প্রজাঃ।।২৪

বাংলা অর্থঃ হে পার্থ! যদি আমি সাবধানতাপূর্বক কর্তব্যকর্ম না করি (তাহলে অত্যন্ত ক্ষতি হবে; কারণ) সাধারণ মানুষ সর্বপ্রকারে আমার পথই অনুসরণ করবে। যদি আমি কর্ম না করি, তাহলে এইসকল লোক পথভ্রষ্ট হবে এবং আমি বর্ণসংকরাদির হেতু এবং এই সমস্ত প্রজাদের বিনাশের কারণ হব।– (রামসুখদাস-২৩-২৪)

সক্তাঃ কর্মণ্য বিদ্বাংসো যথা কুর্বন্তি ভারত।

কুর্যাদ্‌ বিদ্বাংস্তথাসক্তশ্চিকীর্ষুর্লোকসংগ্রহম্‌।।২৫

সরলার্থঃ হে ভারত, অজ্ঞ ব্যক্তিরা কর্মে আসক্তিবিশিষ্ট হইয়া যেরূপ কর্ম করিয়া থাকে, জ্ঞানী ব্যক্তিরা অনাসক্ত চিত্তে লোকরক্ষার্থে সেইরূপ কর্ম করিবেন।- (জগদীশ গীতা-২৫)

অনুবাদঃ হে ভারত! অজ্ঞানীরা যেমন কর্মফলের প্রতি আসক্ত হয়ে তাদের কর্তব্যকর্ম করে, তেমনই জ্ঞানীরা অনাসক্ত হয়ে, মানুষকে সঠিক পথে পরিচালিত করার জন্য কর্ম করবেন।- (যথাযথ-২৫)

ন বুদ্ধিভেদং জনয়েদজ্ঞানাং কর্মসংঙ্গিনাম্‌।

যোজয়েৎ সর্ককর্মাণি বিদ্বান্‌ যুক্তঃ সমাচরন্‌।।২৬

সরলার্থঃ জ্ঞানীরা কর্মে আসক্ত অজ্ঞানদিগের বুদ্ধিভেদ জন্মাইবেন না। আপনারা অবহিত হইয়া সকল কর্ম অনুষ্ঠান করিয়া তাহাদিগকে কর্মে নিযুক্ত রাখিবেন।- (জগদীশ গীতা-২৬)

অনুবাদঃ জ্ঞানবান ব্যক্তিরা কর্মাসক্ত জ্ঞানহীন ব্যক্তিদের বুদ্ধি বিভ্রান্ত করবেন না। বরং, তাঁরা ভক্তিযুক্ত চিত্তে সমস্ত কর্ম অনুষ্ঠান করে জ্ঞানহীন ব্যক্তিদের কর্মে প্রবৃত্ত করবেন।- (যথাযথ-২৬)

সক্তাঃ কর্মণ্য বিদ্বাংসো যথা কুর্বন্তি ভারত।

কুর্যাদ্‌ বিদ্বাংস্তথাসক্তশ্চিকীর্ষুর্লোকসংগ্রহম্‌।।২৫

ন বুদ্ধিভেদং জনয়েদজ্ঞানাং কর্মসংঙ্গিনাম্‌।

যোজয়েৎ সর্ককর্মাণি বিদ্বান্‌ যুক্তঃ সমাচরন্‌।।২৬

বাংলা অর্থঃ হে ভরতবংশোদ্ভব অর্জুন! কর্মে আসক্ত অজ্ঞ ব্যক্তিরা যেরূপ কর্ম করেন, আসক্তি বর্জিত জ্ঞানী ব্যক্তিগণেরও লোকসংগ্রহার্থে সেরূপ কর্ম করা উচিত। তত্ত্বজ্ঞ মহাপুরুষগণ সতর্ক থেকে কর্মে আসক্ত অজ্ঞ ব্যক্তিদের বুদ্ধিতে ভ্রম উৎপন্ন করবেন না, বরং তাঁরা নিজেরা সমস্ত কর্ম ভালোভাবে অবহিত হয়ে অজ্ঞ ব্যক্তিদেরও সেইরূপে কর্মে নিযুক্ত করে রাখবেন।– (রামসুখদাস-২৫-২৬)

প্রকৃতেঃ ক্রিয়মাণানি গুণৈঃ কর্মাণি সর্বশঃ।

অহঙ্কারবিমূঢ়াত্মা কর্তাহমিতি মন্যতে।।২৭

সরলার্থঃ প্রকৃতির গুণসমূহদ্বারা সর্বতোভাবে কর্মসকল সম্পন্ন হয়। যে অহঙ্কারে মুগ্ধচিত্ত সে মনে করে আমিই কর্তা।- (জগদীশ গীতা-১)

অনুবাদঃ অহঙ্কারে মোহাচ্ছন্ন জীব জড়া প্রকৃতির ত্রিগুণ দ্বারা ক্রিয়মাণ সমস্ত কার্যকে স্বীয় কার্য বলে মনে করে ‘আমি কর্তা’-এই রকম অভিমান করে।- (যথাযথ-২৭)

বাংলা অর্থঃ সকল কর্মে সর্বতোভাবে প্রকৃতির গুণগুলির দ্বারা সম্পন্ন হয়; কিন্তু অহংকারে মোহান্ধ অজ্ঞ ব্যক্তি মনে করে, ‘আমিই কর্তা’।– (রামসুখদাস-২৭)

তত্ত্ববিত্তু মহাবাহো গুণকর্মবিভাগয়োঃ।

গুণাগুণেষু বর্তন্তে ইতি মত্বা ন সজ্জতে।।২৮

সরলার্থঃ কিন্তু হে মহাবাহো, যিনি সত্ত্বরজস্তমগুণ ও মন-বুদ্ধি-ইন্দ্রিয়াদির বিভাগ ও উহাদের পৃথক্‌ পৃথক্‌ কর্ম-বিভাগতত্ত্ব জানিয়াছেন, তিনি ইন্দ্রিয়াদি ইন্দ্রিয়বিষয়ে প্রবৃত্ত আছে ইহা জানিয়া কর্মে আসক্ত হন না, কর্তৃত্বাভিমান করেন না।- (জগদীশ গীতা-২৮)

অনুবাদঃ হে মহাবাহো! তত্ত্বজ্ঞ ব্যক্তি ভগবদ্ভক্তিমুখী কর্ম এ সকাম কর্মের পার্থক্য ভালভাবে অবগত হয়ে, কখনও ইন্দ্রিয়সুখ ভোগাত্মক কার্যে প্রবৃত্ত হন না।- (যথাযথ-২৮)

বাংলা অর্থঃ হে মহাবাহো! যে মহাপুরুষ গুণবিভাগ এবং কর্মবিভাগকে তত্ত্বত জেনেছেন, তিনি ‘সমস্ত গুণই গুণগুলিতে আবর্তিত হয়’-এইরূপ মেনে নিয়ে সেগুলিতে আসক্ত হন না।– (রামসুখদাস-২৮)

প্রকৃতের্গুণসংমূঢ়াঃ সজ্জন্তে গুণকর্মসু।

তানকৃৎস্নবিদো মন্দান্‌ কৃৎস্নবিন্ন বিচালয়েৎ।।২৯

সরলার্থঃ যাহারা প্রকৃতির গুণে মোহিত তাহারা দেহেন্দ্রিয়াদি কর্মে আসক্তিযুক্ত হয়; সেই সকল অল্পবুদ্ধি মন্দমতিদিগকে জ্ঞানিগণ কর্ম হইতে বিচালিত করিবেন না।- (জগদীশ গীতা-২৯)

অনুবাদঃ জড়া প্রকৃতির গুণের দ্বারা মোহাচ্ছন্ন হয়ে, অজ্ঞান ব্যক্তিরা জাগতিক কার্যকলাপে প্রবৃত্ত হয়। কিন্তু তাদের কর্ম নিকৃষ্ট হলেও তত্ত্বজ্ঞানী পুরুষেরা সেই মন্দবুদ্ধি ও অল্পজ্ঞ ব্যক্তিগণকে বিচলিত করেন না।- (যথাযথ-২৯)

বাংলা অর্থ প্রকৃতিজনিত গুণে মোহিত অজ্ঞ ব্যক্তিগণ এবং কর্মে আসক্ত থাকে। এই অল্পবুদ্ধি অজ্ঞ ব্যক্তিগণকে যথার্থ জ্ঞানী মহাপুরুষের কর্ম থেকে বিচালিত করা উচিত নয়।– (রামসুখদাস-২৯)

ময়ি সর্বাণি কর্মাণি সংন্যস্যাধ্যাত্মচেতসা।

নিরাশীর্নির্মমো ভূত্বা যুধ্যস্ব বিগতজ্বরঃ।।৩০

সরলার্থঃ কর্তা ঈশ্বর, তাঁহারই উদ্দেশে ভৃত্যবৎ কর্ম করিতেছি, এইরূপ বিবেক-বুদ্ধি সহকারে সমস্ত কর্ম আমাতে সমর্পণ করিয়া কামনাশূন্য ও মমতাশূন্য হইয়া শোকত্যাগপূর্বক তুমি যুদ্ধ কর।- (জগদীশ গীতা-৩০)

অনুবাদঃ অতএব, হে অর্জুন! অধ্যাত্মচেতনা-সম্পন্ন হয়ে তোমার সমস্ত কর্ম আমাকে সমর্পণ কর এবং মমতাশূন্য, নিষ্কাম ও শোকশূন্য হয়ে তুমি যুদ্ধ কর।- (যথাযথ-৩০)

বাংলা অর্থঃ তুমি বিবেক-বুদ্ধি সহকারে সমস্ত কর্তব্যকর্ম আমাতে অর্পণ করে কামনা, মমতা এবং সন্তাপ পরিত্যাগ করে যুদ্ধরূপ কর্তব্যকর্ম করো।– (রামসুখদাস-৩০)

যে মে মতমিদং নিত্যমনুতিষ্ঠন্তি মানবাঃ।

শ্রদ্ধাবন্তোহনসূয়ন্তে মুচ্যন্তে তেহপি কর্মভিঃ।।৩১

সরলার্থঃ যে মানবগণ শ্রদ্ধাবান্‌ ও অসূয়াশূন্য হইয়া আমার এই মতের অনুষ্ঠান করে, তাহারাও কর্মবন্ধন হইতে মুক্ত হয়।- (জগদীশ গীতা-৩১)

অনুবাদঃ আমার নির্দেশ অনুসারে যে-সমস্ত মানুষ তাঁদের কর্মব্যকর্ম অনুষ্ঠান করেন এবং যাঁরা শ্রদ্ধাবান ও মাৎসর্য রহিত হয়ে এই উপদেশ অনুসরণ করেন, তাঁরাও কর্মবন্ধন থেকে মুক্ত হন।- (যথাযথ-৩১)

বাংলা অর্থঃ যে সকল মানুষ দোষদৃষ্টিরহিত হয়ে শ্রদ্ধা সহকারে আমার এই মতের (পূর্বশ্লোকে বর্ণিত) সর্বদা অনুসরণ করেন, তাঁরাও সমস্ত কর্মবন্ধন হতে মুক্ত হয়ে যান।– (রামসুখদাস-৩১)

যে ত্বেতদভ্যসূয়েন্তো নানুতিষ্ঠন্তি মে মতম্‌।

সর্বজ্ঞানবিমূঢ়াংস্তান্‌ বিদ্ধি নষ্টানচেতসঃ।।৩২

সরলার্থঃ যাহারা অসূয়াপরবশ হইয়া আমার এই মতের অনুষ্ঠান করে না, সেই বিবেকহীন ব্যক্তিগণকে সর্বজ্ঞান-বিমূঢ় ও বিনষ্ট বলিয়া জানিও।- (জগদীশ গীতা-৩২)

অনুবাদঃ কিন্তু যারা অসূয়াপূর্বক আমার এই উপদেশ পালন করে না, তাদেরকে সমস্ত জ্ঞান থেকে বঞ্চিত, বিমূঢ় এবং পরমার্থ লাভের সকল প্রচেষ্টা থেকে ভ্রষ্ট বলে জানবে।- (যথাযথ-৩২)

বাংলা অর্থঃ যে ব্যক্তি দোষদৃষ্টিবশত আমার এই মত পালন না করে, সেই সর্বজ্ঞানবিমূঢ়, বিবেকহীন ব্যক্তিকে বিনষ্ট বলেই জেনো অর্থাৎ তাদের পতন হয়।– (রামসুখদাস-৩২)

সদৃশং চেষ্টতে স্বস্যাঃ প্রকৃতের্জ্ঞানবানপি।

প্রকৃতিং যান্তি ভূতানি নিগ্রহঃ কিং করিষ্যতি।।৩৩

সরলার্থঃ জ্ঞানবান্‌ ব্যক্তিও নিজ প্রকৃতির অনুরূপ কর্ম করিয়া থাকেন। প্রাণিগণ প্রকৃতির অনুসরণ করে; ইন্দ্রিয়-নিগ্রহে কি করিবে?- (জগদীশ গীতা-৩৩)

অনুবাদঃ জ্ঞানবান ব্যক্তিও তাঁর স্বভাব অনুসারে কার্য করেন, কারণ প্রত্যেকেই ত্রিগুণজাত তাঁর স্বীয় স্বভাবকে অনুগমন করেন। সুতরাং নিগ্রহ করে কি লাভ হবে?- (যথাযথ-৩৩)

বাংলা অর্থঃ সমস্ত প্রাণী প্রকৃতিকে অনুসরণ করে, জ্ঞানী ব্যক্তিও নিজ প্রকৃতি অনুযায়ী কর্ম সম্পাদনের জন্য চেষ্টা করেন। তাহলে নিগ্রহের জন্য জেদ করে কী হবে?– (রামসুখদাস-৩৩)

ইন্দ্রিয়স্যেন্দ্রিয়স্যার্থে রাগদ্বেষৌ ব্যবস্থিতৌ।

তয়োর্ন বশমাগচ্ছেৎ তৌ হ্যস্য পরিপন্থিনৌ।।৩৪

সরলার্থঃ সকল ইন্দ্রিয়েরই স্ব স্ব বিষয়ে রাগদ্বেষ অবশ্যম্ভাবী। ঐ রাগদ্বেষের বশীভূত হইও না; উহারা জীবের শত্রু (অথবা শ্রেয়োমার্গের বিঘ্নকারক)।- (জগদীশ গীতা-৩৪)

অনুবাদঃ সমস্ত জীবই ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তুতে আসক্তি অথবা বিরক্তি অনুভব করে, কিন্তু এভাবে ইন্দ্রিয় ও ইন্দ্রিয়ের বিষয়ের বশীভূত হওয়া উচিত নয়, কারণ তা পারমার্থিক প্রগতির পথে প্রতিবন্ধক।- (যথাযথ-৩৪)

বাংলা অর্থঃ ‘ইন্দ্রিয়-ইন্দ্রিয়ে’ অর্থাৎ প্রত্যেক ইন্দ্রিয়েরই নিজ নিজ বিষয়ে মানুষের রাগ এবং দ্বেষ (অনুকূল ও প্রতিকূল) ব্যাপারে স্থিতি হয়। মানুষের ওইগুলির বশীভূত হওয়া উচিত নয়; কারণ এই দুটিই জীবের (পারমার্থিক পথে বিঘ্ন প্রদানকারী) শত্রু।– (রামসুখদাস-৩৪)

শ্রেয়ান্‌ স্বধর্মো বিগুণঃ পরধর্মাৎ স্বনুষ্ঠিতাৎ।

স্বধর্মে নিধনং শ্রেয়ঃ পরধর্মো ভয়াবহঃ।।৩৫

সরলার্থঃ স্বধর্ম কিঞ্চিদ্দোষবিশিষ্ট হইলেও উহা উত্তমরূপে অনুষ্ঠিত পরধর্ম অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। স্বধর্মে নিধনও কল্যাণকর, কিন্তু পরধর্ম গ্রহণ করা বিপজ্জনক।- (জগদীশ গীতা-৩৫)

অনুবাদঃ স্বধর্মের অনুষ্ঠান দোষযুক্ত হলেও উত্তমরূপে অনুষ্ঠিত পরধর্ম থেকে উৎকৃষ্ট। স্বধর্ম সাধনে যদি মৃত্যু হয়, তাও মঙ্গলজনক, কিন্তু অন্যের ধর্মের অনুষ্ঠান করা বিপজ্জনক।- (যথাযথ-৩৫)

বাংলা অর্থঃ উত্তমরূপে অনুষ্ঠিত পরধর্ম অপেক্ষা স্বল্পগুণবিশিষ্ট নিজ ধর্ম শ্রেষ্ঠ। স্বধর্মে মৃত্যুও কল্যাণকারী, কিন্তু পরধর্ম ভয়প্রদানকারী, বিপজ্জনক। – (রামসুখদাস-৩৫)

অর্জুন উবাচ

অথ কেন প্রযুক্তাহয়ং পাপংচরতি পুরুষঃ।

অনিচ্ছন্নপি বার্ষ্ণেয় বলাদিব নিয়োজিতঃ।।৩৬

সরলার্থঃ অর্জুন কহিলেন-হে কৃষ্ণ, লোকে কাহাদ্বারা প্রযুক্ত হইয়া অনিচ্ছাসত্ত্বেও যেন বলপূর্বক নিয়োজিত হইয়াই পাপাচরণ করে?- (জগদীশ গীতা-৩৬)

অনুবাদঃ অর্জুন বললেন-হে বার্ষ্ণেয়! মানুষ কার দ্বারা জালিত হয়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও যেন বলপূর্বক নিয়োজিত হয়েই পাপাচরণে প্রবৃত্ত হয়?- (যথাযথ-৩৬)

বাংলা অর্থঃ অর্জুন বললেন- হে বার্ষ্ণেয়! তাহলে মানুষ অনিচ্ছা সত্ত্বেও কার দ্বারা বলপূর্বক পাপাচরণ করার জন্য প্রেরিত হয়ে থাকে।– (রামসুখদাস-৩৬)

শ্রীভগবান উবাচ

কাম এষ ক্রোধ এষ রজোগুণসমুদ্ভবঃ।

মহাশনো মহাপাপ্মা বিদ্ধ্যেনমিহ বৈরিণম্‌।।৩৭

সরলার্থঃ শ্রীভগবান্‌ বলিলেন, ইহা কাম, ইহাই ক্রোধ। ইহা রজোগুণোৎপন্ন, ইহা দুষ্পূরণীয় এবং অতিশয় উগ্র। ইহাকে সংসারে শত্রু বলিয়া জানিবে।- (জগদীশ গীতা-৩৭)

অনুবাদঃ পরমেশ্বর ভগবান বললেন-হে অর্জুন! রজোগুণ থেকে সমুদ্ভূত কামই মানুষকে এই পাপে প্রবৃত্ত করে এবং এই কামই ক্রোধে পরিণত হয়। কাম সর্বগ্রাসী ও পাপাত্মক; কামকেই জীবের প্রধান শত্রু বলে জানবে।- (যথাযথ-৩৭)

বাংলা অর্থঃ শ্রীভগবান বললেন- রজোগুণ হতে উৎপন্ন এই কাম অর্থাৎ কামনাই হল পাপের কারণ। এই কামনাই ক্রোধে পরিণত হয়। এটি দুষ্পূরণীয় অর্থাৎ কিছুতেই তৃপ্ত হয় না এবং মহাপাপী। এই বিষয়ে তুমি একেই শত্রু বলে জানবে।– (রামসুখদাস-৩৭)

ধূমেনাব্রিয়তে বহ্নির্যথাদর্শো মলেন চ।

যথোল্বেনাবৃতো গর্ভস্তথা তেনেদমাবৃতম্‌।।৩৮

সরলার্থঃ যেমন ধূমদ্বারা বুহ্নি আবৃত থাকে, মলদ্বারা দর্পণ আবৃত হয়, জরায়ুদ্বারা গর্ভ আবৃত থাকে, সেইরূপ কামের দ্বারা জ্ঞান আবৃত থাকে।- (জগদীশ গীতা-৩৮)

অনুবাদঃ অগ্নি যেমন ধূম দ্বারা আবৃত থাকে, দর্পণ যেমন ময়লার দ্বারা আবৃত থাকে অথবা গর্ভ যেমন জরায়ুর দ্বারা আবৃত থাকে, তেমনই জীবাত্মা বিভিন্ন মাত্রায় এই কামের দ্বারা আবৃত থাকে।- (যথাযথ-৩৮)

বাংলা অর্থঃ যেমন ধূম দ্বারা বহ্নি, ময়লা দ্বারা দর্পণ এবং জরায়ু দ্বারা গর্ভ আবৃত থাকে, সেইরূপ কামের দ্বারা জ্ঞান অর্থাৎ বিবেক আবৃত থাকে।– (রামসুখদাস-৩৮)

আবৃতং জ্ঞানমেতেন জ্ঞানিনো নিত্যবৈরিণা।

কামরূপেণ কৌন্তেয় দুষ্পুরেণানলেন চ।।৩৯

সরলার্থঃ হে কৌন্তেয়, জ্ঞানীদিগের নিত্যশত্রু এই দুষ্পূরণীয় অগ্নিতুল্য কামদ্বারা জ্ঞান আচ্ছন্ন থাকে।- (জগদীশ গীতা-৩৯)

অনুবাদঃ কামরূপী চির শত্রুর দ্বারা জীবের শুদ্ধ চেতনা আবৃত হয়। এই কাম দুর্বারিত অগ্নির মতো চিরঅতৃপ্ত।- (যথাযথ-৩৯)

বাংলা অর্থঃ হে কৌন্তেয়! বিবেকশীল পুরুষের চিরশত্রু অগ্নির ন্যায় দুষ্পূরণীয় এই কাম অর্থাৎ কামনার দ্বারা মানুষের বিবেক-বুদ্ধি (জ্ঞান) আচ্ছন্ন থাকে।– (রামসুখদাস-৩৯)

ইন্দ্রিয়াণি মনোবুদ্ধিরস্যাধিষ্ঠানমুচ্যতে।

এতৈর্বিমোহয়ত্যেষ জ্ঞানমাবৃত্য দেহিনম্‌।।৪০

সরলার্থঃ ইন্দ্রিয়সকল, মন ও বু্দ্ধি-ইহারা কামের অধিষ্ঠান বা আশ্রয়স্থান বলিয়া কথিত হয়। কাম ইহাদিগকে অবলম্বন করিয়া জ্ঞানকে আচ্ছন্ন করিয়া জীবকে মুগ্ধ করে।- (জগদীশ গীতা-৪০)

অনুবাদঃ ইন্দ্রিয়সমূহ, মন ও বুদ্ধি এই কামের আশ্রয়স্থল। এই ইন্দ্রিয় আদির দ্বারা কাম জীবের প্রকৃত জ্ঞানকে আচ্ছন্ন করে তাকে বিভ্রান্ত করে।- (যথাযথ-৪০)

বাংলা অর্থঃ ইন্দ্রিয়াদি, মন ও বুদ্ধি- এগুলিকে কামনার আশ্রয় স্থান বলা হয়েছে। কামনা এগুলিকে (ইন্দ্রিয়াদি, মন, বুদ্ধি) অবলম্বনপূর্বক জ্ঞানকে আবৃত করে দেহাভিমানী মানুষকে মোহগ্রস্ত করে।– (রামসুখদাস-৪০)

তস্মাৎ ত্বমিন্দ্রিয়াণ্যাদৌ নিয়ম্য ভরতর্ষভ।

পাপ্মানং প্রজহি হ্যেনং জ্ঞানবিজ্ঞাননাশনম্‌।।৪১

সরলার্থঃ হে ভরতশ্রেষ্ঠ, সেই হেতু তুমি অগ্রে ইন্দ্রিয়গণকে বশীভূত করিয়া জ্ঞানবিজ্ঞান-বিনাশী পাপস্বরূপ কামকে বিনষ্ট কর (বা পরিত্যাগ কর)।- (জগদীশ গীতা-৪১)

অনুবাদঃ অতএব, হে ভরতশ্রেষ্ঠ! তুমি প্রথমে ইন্দ্রিয়গুলিকে নিয়ন্ত্রিত করে জ্ঞান ও বিজ্ঞান-নাশক পাপের প্রতীকরূপ এই কামকে বিনাশ কর।- (যথাযথ-৪১)

বাংলা অর্থঃ সেইহেতু, হে ভরতশ্রেষ্ঠ অর্জুন! তুমি সর্বাগ্রে ইন্দ্রিয়গুলিকে বশীভূত করে, জ্ঞান-বিজ্ঞানবিনাশী ঘোর পাপস্বরূপ কামকে (কামনাকে) সবলে বিনাশ করো।– (রামসুখদাস-৪১)

ইন্দ্রিয়াণি পরাণ্যাহুরিন্দ্রিয়েভ্যঃ পরং মনঃ।

মনসস্তু পরা বুদ্ধির্যোবুদ্ধেঃ পরতস্তু সঃ।।৪২

সরলার্থঃ ইন্দ্রিয়সকল শ্রেষ্ঠ বলিয়া কথিত হয়; ইন্দ্রিয়গণ অপেক্ষা মন শ্রেষ্ঠ; মন অপেক্ষা বুদ্ধি শ্রেষ্ঠ; বুদ্ধি হইতে যিন শ্রেষ্ঠ তিনিই আত্মা।- (জগদীশ গীতা-৪২)

অনুবাদঃ স্থূল জড় পদার্থ থেকে ইন্দ্রিয়গুলি শ্রেয়; ইন্দ্রিয়গুলি থেকে মন শ্রেয়; মন থেকে বুদ্ধি শ্রেয়; আর তিনি (আত্মা) সেই বুদ্ধি থেকেও শ্রেয়।- (যথাযথ-৪২)

এবং বুদ্ধেঃ পরং বুদ্ধা সংস্তভ্যাত্মানমাত্মনা।

জহি শত্রুং মহাবাহো কামরূপং দুরাসদম্‌।।৪৩

সরলার্থঃ হে মহাবাহো, এইরূপে বুদ্ধির সাহায্যে বুদ্ধিরও উপরে অবস্থিত পরমাত্মা সম্বন্ধে সচেতন হইয়া, আত্মাকে আত্মশক্তির প্রয়োগেই ধীর ও নিশ্চল কর এবং দুর্ণিবার শত্রু কামকে বিনাশ কর (শ্রীঅরবিন্দ)।

অথবা, নিজেই নিজেকে সংযত করিয়া কামরূপ দুর্জয় শত্রুকে মারিয়া ফেল (লোকমান্য তিলক)। অথবা, নিশ্চয়াত্মিকা বুদ্ধিদ্বারা মনকে নিশ্চল করিয়া কামরূপ দুর্জয় শত্রু (কামকে) বিনাশ কর (শ্রীধরস্বমিকৃত টীকা)।- (জগদীশ গীতা-৪৩)

অনুবাদঃ হে মহাবীর অর্জুন! নিজেকে জড় ইন্দ্রিয়, মন ও বুদ্ধির অতীত জেনে, নিশ্চয়াত্মিকা বুদ্ধির দ্বারা মনেকে স্থির কর এবং এভাবেই চিৎ-শক্তির দ্বারা কামরূপ দুর্জয় শত্রুকে জয় কর।- (যথাযথ-৪৩)

ইন্দ্রিয়াণি পরাণ্যাহুরিন্দ্রিয়েভ্যঃ পরং মনঃ।

মনসস্তু পরা বুদ্ধির্যোবুদ্ধেঃ পরতস্তু সঃ।।৪২

এবং বুদ্ধেঃ পরং বুদ্ধা সংস্তভ্যাত্মানমাত্মনা।

জহি শত্রুং মহাবাহো কামরূপং দুরাসদম্‌।।৪৩

বাংলা অর্থঃ ইন্দ্রিয়গুলিকে (স্থূলশরীর অপেক্ষা) শ্রেষ্ঠ (সবল, প্রকাশক, ব্যাপক এবং সূক্ষ্ম) বলা হয়; ইন্দ্রিয়গুলি অপেক্ষা শ্রেয়তর হল মন, মনের থেকে শ্রেয়তর বুদ্ধি বুদ্ধি, বুদ্ধির থেকেও যা প্রবল তা হল কাম। এইভাবে বুদ্ধির চেয়েও পর অর্থাৎ কামকে জেনে নিজের দ্বারা নিজেকে (আত্মশক্তির দ্বারা) বশীভূত করে, হে মহাবাহো! তুমি এই কামরূপ দুর্জয় শত্রুকে নাশ করো।– (রামসুখদাস-৪২-৪৩)

ওঁ তৎসদিতি শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতাসূপনিষৎসু ব্রহ্মবিদ্যায়াং যোগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণার্জুন-সংবাদে-কর্মযোগো নাম তৃতীয়োহধ্যায়ঃ।

ধন্যবাদ” 

=বাংলা হাউ ডট কম=

((www.banglahow.com))