শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ের বাংলা সরলার্থ (সাংখ্যযোগ)

শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়

শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতা হল পরমেশ্বর ভগবানের মুখনিঃসৃত বাণী। এ গীতা হল সকল গ্রন্থের সার-স্বরূপ। শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতা সংস্কৃত ভাষায় রচিত । তাই বাঙ্গালী বা বাংলা ভাষা-ভাষীদের জন্য গীতার মর্মাথ উপলব্ধি করার সহায়ক হিসাবে শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ের সংস্কৃত শ্লোকের বাংলা অর্থ সহ বাঙ্গানুবাদ দেয়া হল। এ বঙ্গানুবাদ স্বনামধন্য  তিনজন অনুবাদকের শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতা গ্রন্থের বাংলা অর্থ একসাথে বর্ণিত হল।

অথ দ্বিতীয়োহধ্যায়ঃ

সাংখ্যযোগ

সঞ্জয় উবাচ

তং তথা কৃপয়াবিষ্টমশ্রুপূর্ণাকুলেক্ষণম্‌।

বিষীদন্তমিদং বাক্যমুবাচ মধুসূদনঃ।।১

সরলার্থঃ সঞ্জয় বলিলেন, তখন মধুসূদন কৃপাবিষ্ট অশ্রুপূর্ণলোচন বিষণ্ন অর্জুনকে এই কথা বলিলেন- (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-১)

অনুবাদঃ সঞ্জয় বললেন- অর্জুনকে এভাবে অনুতপ্ত, ব্যাকুল ও অশ্রুসিক্ত দেখে, কৃপায় আবিষ্ট হয়ে মধুসূদন বা শ্রীকৃষ্ণ এই কথাগুলি বললেন।- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-১)

বাংলা অর্থঃ  সঞ্জয় বললেন- কাপুরুষতায় আবিষ্ট, বিষাদমগ্ন এবং অশ্রুপূর্ণ অবরুদ্ধ-নেত্র অর্জুনকে ভগবান এই বাক্যগুলি (পরের শ্লোকগুলিতে) বললেন।– (স্বামী রামসুখদাস-১)

শ্রীভগবানুবাচ

কুতস্তা কশ্মলমিদং বিষমে সমুপস্থিতম্‌।

অনার্যজুষ্টমস্বর্গ্যমকীর্ত্তিকরমর্জুন।।২

সরলার্থঃ শ্রীভগবান্‌ বলিলেন, হে অর্জুন, এই সঙ্কট সময়ে অনার্যজনোচিত, স্বর্গহানিকর, অকীর্তিকর তোমার এই মোহ কোথা হইতে উপস্থিত হইল?- (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-২)

অনুবাদঃ পুরুষোত্তম শ্রীভগবান বললেন- প্রিয় অর্জুন, এই ঘোর সঙ্কটময় যুদ্ধস্থলে যারা জীবনের প্রকৃত মূল্য বোঝে না, সেই সব অনার্যের মতো শোকানল তোমার হৃদয়ে কিভাবে প্রজ্বলিত হল? এই ধরনের মনোভাব তোমাকে স্বর্গলোকে উন্নীত করবে না, পক্ষান্তরে তোমার সমস্ত যশরাশি বিনষ্ট করবে।- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-২)

বাংলা অর্থঃ শ্রীভগবান বললেন- হে অর্জুন! এই বিষম সময়ে তোমার এই কাপুরুষতা কোথা থেকে এল, যা কোনো শ্রেষ্ঠ পুরুষের হয় না, যাতে স্বর্গলাভ হয় না এবং যা কীর্তিমান করে না।- (স্বামী রামসুখদাস-২)

ক্লৈব্যং মাস্ম গমঃ পার্থ নৈতৎ ত্বয্যুপপদ্যতে।

ক্ষুদ্রং হৃদয়দৌর্বল্যং ত্যক্ত্বোত্তিষ্ঠ পরন্তপ।।৩

সরলার্থঃ হে পার্থ, কাতর হইও না। এইরূপ পৌরুষহীনতা তোমাতে শোভা পায় না। হে পরন্তপ, তুচ্ছ হৃদয়ের দুর্বলতা ত্যাগ করিয়া (যুদ্ধার্থে) উত্থিত হও।- (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-৩)

অনুবাদঃ হে পার্থ! এই সম্মান হানিকর ক্লীবত্বের বশবর্তী হয়ো না। এই ধরনের আচরণ তোমার পক্ষে অনুচিত। হে পরন্তপ! হৃদয়ের এই ক্ষুদ্র দুর্বলতা পরিত্যাগ করে তুমি উঠে দাঁড়াও।- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-৩)

বাংলা অর্থঃ হে পৃথানন্দন অর্জুন! এই নপুংসকতা আশ্রয় কোরো না; এ তোমার উচিত নয়। হে পরন্তপ! এই তুচ্ছ হৃদয়- দৌর্বল্য ত্যাগ করে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হও।- (স্বামী রামসুখদাস-৩)

অর্জুন উবাচ

কথং ভীষ্মমহং সংখ্যে দ্রোণঞ্চ মধুসূদন।

উষুভিঃ প্রতিযোৎস্যামি পূজার্হাবরিসূদন।।৪

সরলার্থঃ অর্জুন বলিলেন, হে শত্রুমর্দন মধুসূদন, আমি যুদ্ধকালে পূজনীয় ভীষ্ম ও দ্রোণের সহিত কিরূপে বাণের দ্বারা প্রতিযুদ্ধ করিব? (অর্থাৎ তাঁহারা আমার শরীরে বাণ নিক্ষেপ করিলেও আমি গুরুজনের অঙ্গে অস্ত্র নিক্ষেপ করিতে পারিব না)।- (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-৪)

অনুবাদঃ অর্জুন বললেন- হে অরিসূদন! হে মধুসূদন! এই যুদ্ধক্ষেত্রে ভীষ্ম ও দ্রোণের মতো পরম পূজনীয় ব্যক্তিদের কেমন করে আমি বাণের দ্বারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করব?- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-৪)

বাংলা অর্থঃ অর্জুন বললেন- হে মধুসূদন! রণভূমিতে ভীষ্ম এবং দ্রোণের সঙ্গে বাণ দ্বারা আমি কী করে যুদ্ধ করব? কারণ হে অরিসূদন! এঁরা দুজনেই আমার পূজনীয়।- (স্বামী রামসুখদাস-৪)

গুরূনহত্বা হি মহানুভাবান্‌

শ্রেয়ো ভোক্তুং ভৈক্ষ্যমপীহ লোকে।

হত্বার্থকামাংস্তু গুরূনিহৈব

ভূঞ্জীয় ভোগান্‌ রুধির-প্রদিগ্ধান্‌।।৫

সরলার্থঃ মহানুভব গুরুজনদিগকে বধ না করিয়া ইহলোকে ভিক্ষান্ন-ভোজন করাও শ্রেয়ঃ। কেননা গুরুজনদিগকে বধ করিয়া ইহলোকে যে অর্থকাম ভোগ করিব তাহা ত (গুরুজনের) রুধির-লিপ্ত।- (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-৫)

অনুবাদঃ আমার মহানুভব শিক্ষাগুরুদের জীবন হানি করে এই জগৎ ভোগ করার থেকে বরং ভিক্ষা করে জীবন ধারণ করা ভাল। তাঁরা পার্থিব বস্তুর অভিলাষী হলেও আমার গুরুজন। তাঁদের হত্যা করা হলে, যুদ্ধলব্ধ সমস্ত ভোগ্যবস্তু তাঁদের রক্তমাখা হবে।- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-৫)

বাংলা অর্থঃ মহানুভব গুরুজনদিগকে বধ করা অপেক্ষা ইহলোকে ভিক্ষান্ন গ্রহণই আমি শ্রেষ্ঠ বলে মনে করি। কারণ গুরুজনদের বধ করে শোণিতসিক্ত এই ধনসম্পদ এবং রাজ্যই তো ভোগ করতে হবে!।।- (স্বামী রামসুখদাস-৫)

ন চৈতদ্বিদ্মঃ কতরন্নো গরীয়ো

যদ্বা জয়েম যদি বা নো জয়েয়ুঃ।

যানেব হত্বা ন জিজীবিষাম-

স্তেহবস্থিতাঃ প্রমুখে ধার্তরাষ্ট্রাঃ।।৬

সরলার্থঃ আমরা জয়ী হই অথবা আমাদিগকে ইহারা জয় করুক, এই উভয়ের মধ্যে কোন্‌টি শ্রেয়স্কর তাহা বুঝিতে পারিতেছি না-যাহাদিগকে বধ করিয়া বাঁচিয়া থাকিতে চাহি না, সেই ধৃতরাষ্ট্র পুত্রগণ সম্মুখে অবস্থিত।- (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-৬)

অনুবাদঃ তাদের জয় করা শ্রেয়, না তাদের দ্বারা পরাজিত হওয়া শ্রেয়, তা আমি বুঝতে পারছি না। আমরা যদি ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের হত্যা করি, তা হলে আমাদের আর বেঁচে থাকতে ইচ্ছা করবে না। তবুও এই রণাঙ্গনে তারা আমাদের সামনে উপস্থিত হয়েছে।- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-৬)

বাংলা অর্থঃ আমরা সঠিকভাবে জানি না যে যুদ্ধ করা বা না-করা কোনটি আমাদের পক্ষে শ্রেয়স্কর; আমরা এও জানি না যে আমরা জয়লাভ করব, না ওঁরা জয়লাভ করবেন। যে ধৃতরাষ্ট্রের আত্মীয়স্বজনদের বধ করে আমরা শুধু জয়লাভ কেন, বাঁচতে পর্যন্ত চাই না, আজ তাঁরাই আমাদের সামনে উপস্থিত।- (স্বামী রামসুখদাস-৬)

কার্পণ্যদোষোপহতস্বভাবঃ

পৃচ্ছামি ত্বাং ধর্মসংমূঢ়চেতাঃ।

যচ্ছ্রেয়ঃ স্যান্নিশ্চিতং ব্রুহি তন্মে

শিষ্যস্তেহহং শাধি মাং ত্বাং প্রপন্নম্‌।।৭

সরলার্থঃ (গুরুজনদিগকে বধ করিয়া কিরূপে প্রাণ ধারণ করিব এইরূপ চিন্তাপ্রযুক্ত) চিত্তের দীনতায় আমি অভিভূত হইয়াছি; প্রকৃত ধর্ম কি এ সম্বন্ধে আমার চিত্ত বিমূঢ় হইয়াছে; যাহা আমার ভাল হয়, আমাকে নিশ্চিত করিয়া তাহা বল, আমি তোমার শিষ্য, তোমার শরণাপন্ন, আমাকে উপদেশ দাও। (আমাকে আর তুমি সখা বলিয়া মনে করিও না, আমি তোমার শিষ্য)।- (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-৭)

অনুবাদঃ কার্পণ্যজনিত দুর্বলতার প্রভাবে আমি এখন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়েছি এবং আমার কর্তব্য সম্বন্ধে বিভ্রান্ত হয়েছি। এই অবস্থায় আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করছি, এখন কি করা আমার পক্ষে শ্রেয়স্কর, তা আমাকে বল। এখন আমি তোমার শিষ্য এবং সর্বতোভাবে তোমার শরণাগত। দয়া করে তুমি আমাকে নির্দেশ দাও।- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-৭)

বাংলা অর্থঃ কাপুরুষারূপ দোষের অভিভূত-স্বজন এবং ধর্ম বিষয়ে বিমূঢ়চিত্ত আমি আপনাকে জিজ্ঞাসা করছি যে, যেটি নিশ্চিতরূপে আমার পক্ষে (কণ্যাণকারী) শ্রেয়, সেটি বলুন। আমি আপনার শিষ্য, আপনার শরণাগত, আমাকে শিক্ষা দান করুন।- (স্বামী রামসুখদাস-৭)

ন হি প্রপশ্যামি-মমাপনুদ্যাৎ যচ্ছোকমুচ্ছোষণমিন্দ্রিয়াণাম্।

অবাপ্য ভূমাবসপত্নমৃদ্ধং রাজ্যং সুরাণামপি চাধিপত্যম্‌।।৮

সরলার্থঃ পৃথিবীতে নিষ্কন্টক সমৃদ্ধ রাজ্য এবং সুরলোকের আধিপত্য পাইলেও যে শোক আমার ইন্দ্রিয়গণকে বিশোষণ করিবে তাহা কিসে যাইবে, আমি দেখিতেছি না।- (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-৮)

অনুবাদঃ আমার ইন্দ্রিয়গুলিকে শুকিয়ে দিচ্ছে যে শোক, তা দূর করবার কোন উপায় আমি খুঁজে পাচ্ছি না। এমন কি স্বর্গের দেবতাদের মতো আধিপত্য নিয়ে সমৃদ্ধিশালী, প্রতিদ্বন্দ্বিতাবিহীন রাজ্য এই পৃথিবীতে লাভ করলেও আমার এই শোকের বিনাশ হবে না।- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-৮)

বাংলা অর্থঃ পৃথিবীতে ধনধান্যসমৃদ্ধ নিষ্কন্টক রাজ্য এবং স্বর্গে দেবতাগণের আধিপত্য যদি পাওয়া যায়, তাহলেও আমার ইন্দ্রিয়সমূহের সন্তাপক শোক দূরীভূত হবে বলে আমার মনে হয় না।- (স্বামী রামসুখদাস-৮)

সঞ্জয় উবাচ

এবমুক্ত্বা হৃষীকেশং গুড়াকেশঃ পরন্তপঃ।

ন যোৎস্য ইতি গোবিন্দমুক্ত্বা তুষ্ণীং বভূব হ।।৯

সরলার্থঃ সঞ্জয় কহিলেন-শত্রুতাপন অর্জুন হৃষীকেশ গোবিন্দকে এইরূপ বলিয়া ‘আমি যুদ্ধ করিব না’ এই কথা কহিয়া তূষ্ণীম্ভাব অবলম্বন করিলেন (নীরব রহিলেন)।- (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-৯)

অনুবাদঃ সঞ্জয় বললেন- এভাবে মনোভাব ব্যক্ত করে গুড়াকেশ অর্জুন তখন হৃষীকেশকে বললেন, “হে গোবিন্দ! আমি যুদ্ধ করব না”, এই বলে তিনি মৌন হলেন।- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-৯)

বাংলা অর্থঃ –সঞ্জয় বললেন- হে শত্রুতাপন ধৃতরাষ্ট্র! এই কথা বলে নিদ্রাজয়ী অর্জুন ভগবান গোবিন্দকে ‘আমি যুদ্ধ করব না’ স্পষ্টভাবে জানিয়ে চুপ করে গেলেন।- (স্বামী রামসুখদাস-৯)

তমুবাচ হৃষীকেশঃ প্রহসন্নিব ভারত।

সেনয়োরুভয়োর্মধ্যে বিষীদন্তমিদং বচঃ।।১০

সরলার্থঃ হে ভারত (ধৃতরাষ্ট্র), হৃষীকেশ উভয় সেনার মধ্যে বিষাদপ্রাপ্ত অর্জুনকে হাসিয়া এই কথা বলিলেন।- (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-১০)

অনুবাদঃ হে ভরতবংশীয় ধৃতরাষ্ট্র! সেই সময় স্মিত হেসে, শ্রীকৃষ্ণ উভয় পক্ষের সৈন্যদের মাধখানে বিষাদগ্রস্ত অর্জুনকে এই কথা বললেন।- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-১০)

বাংলা অর্থঃ –হে ভরতবংশোদ্ভব ধৃতরাষ্ট্র! দুই পক্ষের সেনার মধ্যস্থলে বিষাদমগ্ন সেই অর্জুনকে ভগবা হৃষীকেশ স্মিতহাস্যে এই (পরবর্তী শ্লোকে বলা) কথা বললেন।- (স্বামী রামসুখদাস-১০)

শ্রীভগবানুবাচ

আশোচ্যানন্বশোচস্ত্বং প্রজ্ঞাবাদাংশ্চ ভাষসে।

গতাসুনগতাসূংশ্চ নানুশোচন্তি পণ্ডিতাঃ।১১

সরলার্থঃ শ্রীভগবান্‌ বলিলেন, যাহাদিগের জন্য শোক করার কোন কারণ নাই তুমি তাহাদিগের জন্য শোক করিতেছ, আবার পণ্ডিতের ন্যায় কথা বলিতেছ। কিন্তু যাঁহারা প্রকৃত তত্ত্বজ্ঞানী তাঁহারা কি মৃত কি জীবিত, কাহারও জন্য শোক করেন না।- (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-১১)

অনুবাদঃ পরমেশ্বর ভগবান বললেন-তুমি প্রাজ্ঞের মতো কথা বলছ, অথচ যে বিষয়ে শোক করা উচিত নয়, সেই বিষয়ে শোক করছ। যাঁরা যথার্থই পণ্ডিত তাঁরা কখনও জীবিত অথবা মৃত কারও জন্যই শোক করেন না।- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-১১)

বাংলা অর্থঃ শ্রীভগবান বললেন- যাদের জন্য শোক করা উচিত নয় তাদের জন্য তুমি শোক করছ, আবার পণ্ডিতদের মতো কথা বলছ; কিন্তু পণ্ডিতগণ মৃত বা জীবিত কারো জন্য শোক করেন না।- (স্বামী রামসুখদাস-১১)

ন ত্বেবাহং জাতু নাসং ন ত্বং মেনে জনাধিপাঃ।

ন চৈব ন ভবিষ্যামঃ সর্বে বয়মতঃপরম্‌।।১২

সরলার্থঃ আমি পূর্বে ছিলাম না, বা তুমি ছিলে না বা এই নৃপতিগণ ছিলেন না, এমন নহে (অর্থাৎ পরেও সকলে থাকিব)।- (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-১২)

অনুবাদঃ এমন কোন সময় ছিল না যখন আমি, তুমি ও এই সমস্ত রাজারা ছিলেন না এবং ভবিষ্যতেও কখনও আমাদের অস্তিত্ব বিনষ্ট হবে না।- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-১২)

বাংলা অর্থঃ কোনো সময়ে আমি ছিলাম না বা তুমি ছিলে না অথবা এই রাজন্যবর্গ ছিল না, একথা ছিক নয়। আর এর পরে আমি, তুমি এবং এই নৃপতিবৃন্দ- এরা সকলে থাকবে না তাও ছিক নয়।- (স্বামী রামসুখদাস-১২)

দেহিনোহস্মিন্‌ যথা দেহে কৌমারং যৌবনং জরা।

তথা দেহান্তর প্রাপ্তির্ধীরস্ত্রত্র ন মুহ্যতি।।১৩

সরলার্থঃ জীবের এই দেহে বাল্য, যৌবন ও বার্ধক্য কালের গতিতে উপস্থিত হয়। তেমনি কালের গতিতে দেহান্তর-প্রাপ্তও হয়। জ্ঞানীগণ তাহাতে মোহগ্রন্ত হন না।- (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-১৩)

অনুবাদঃ দেহীর দেহ যেভাবে কৌমার, যৌবন ও জরার মাধ্যমে তার রূপ পরিবর্তন করে চলে, মৃত্যুকালে তেমনই ঐ দেহী (আত্মা) এক দেহ থেকে অন্য কোনও দেহে দেহান্তরিত হয়। স্থিতপ্রজ্ঞ পণ্ডিতেরা কখনও এই পরিবর্তনে মুহ্যমান হন না।- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-১৩)

বাংলা অর্থঃ প্রত্যেক দেহধারীরই এই মনুষ্যদেহে যেমন বাল্য, যৌবন এবং বার্ধক্য উপস্থিত হয়, তেমনি দেহান্তর প্রাপ্তিও হয়। ধীর ব্যক্তিগণ তাতে মোহগ্রস্ত হয় না।- (স্বামী রামসুখদাস-১৩)

মাত্রাস্পর্শাস্তু কৌন্তেয় শীতোষ্ণসুখদু:খদাঃ।

আগমাপায়িনোহনিত্যাস্ত্যংস্তিতিক্ষস্ব ভারত।।১৪

সরলার্থঃ হে কৌন্তেয়, ইন্দ্রিয়বৃত্তির সহিত বিষয়াদির সংযোগেই শীতোষ্ণাদি সুখদুঃখ প্রদান করে। সেগুলির একবার উৎপত্তি হয়, আবার বিনাশ হয়, সুতরাং ওগুলি অনিত্য। অতএব সে সকল সহ্য কর।- (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-১৪)

অনুবাদঃ হে কৌন্তেয়! ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে বিষয়ের সংযোগের ফলে অনিত্য সুখ ও দুঃখের অনুভব হয়। সেগুলি ছিক যেন শীত ও গ্রীষ্ম ঋতুর গমনাগমনের মতো। হে ভরতকুল-প্রদীপ! সেই ইন্দ্রিয়জাত অনুভূতির দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে সেগুলি সহ্য করার চেষ্টা কর।- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-১৪)

বাংলা অর্থঃ হে কুন্তীনন্দন! ইন্দ্রিয়গুলির দ্বারা যার জ্ঞান হয় সেইসকল জড়বস্তু শীত (অনুকূল) এবং উষ্ণ (প্রতিকূল) ভাবনানুযায়ী সুখ ও দুঃখ প্রদান করে। সেগুলি উৎপত্তি ও বিনাশশীল, সুতরাং তা অনিত্য। তাই হে ভরতবংশোদ্ভব অর্জুন, তুমি এগুলিকে সহ্য করো।- (স্বামী রামসুখদাস-১৪)

যং হি ন ব্যথয়ন্ত্যেতে পুরুষং পুরুষর্ষভ।

সমদুঃখসুখং ধীরং সোহমৃতত্বায় কল্পতে।।১৫

সরলার্থঃ হে পুরুষশ্রেষ্ঠ, যে স্থিরবুদ্ধি ব্যক্তি এই সকল বিষয়স্পর্শ-জনিত সুখদুঃখ সমভাবে গ্রহণ করেন, উহাতে বিচলিত হন না, তিনি অমৃতত্ব লাভে সমর্থ হন।- (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-১৫)

অনুবাদঃ হে পুরুষশ্রেষ্ঠ (অর্জুন)! যে জ্ঞানী ব্যক্তি সুখ ও দুঃখকে সমান জ্ঞান করেন এবং শীত ও উষ্ণ আদি দ্বন্দ্বে বিচলিত হন না, তিনিই মুক্তি লাভের প্রকৃত অধিকারী।- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-১৫)

বাংলা অর্থঃ হে পুরুষশ্রেষ্ঠ অর্জুন! সুখ-সুঃখে সমভাবে স্থিত যে ধীর ব্যক্তিকে এই বিষয়স্পর্শজনিত সুখ-দুঃখ বিচলিত করে না, তিনি অমৃতত্ব লাভে সমর্থ হন অর্থাৎ তিনি অমন হন।- (স্বামী রামসুখদাস-১৫)

নাসতো বিদ্যতে ভাবো নাভাবো বিদ্যতে সতঃ।

উভয়োরপি দৃষ্টোহন্তস্ত্বনয়োস্তত্ত্বদর্শিভিঃ।।১৬

সরলার্থঃ অসৎ বস্তুর ভাব (সত্ত্বা, স্থায়িত্ব) নাই, সৎবস্তুর অভাব (নাশ) নাই; তত্ত্বদর্শিগণ এই সদসৎ উভয়েরই চরম দর্শন করিয়াছেন (স্বরূপ উপলব্ধি করিয়াছেন)।- (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-১৬)

অনুবাদঃ যাঁরা অত্ত্বদ্রষ্টা তাঁরা সিদ্ধান্ত করেছেন যে অনিত্য জড় বস্তুর স্থায়িত্ব নেই এবং নিত্য বস্তু আত্মার কখনও বিনাশ হয় না। তাঁরা উভয় প্রকৃতির যথার্থ স্বরূপ উপলিব্ধি করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত কয়েছেন।- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-১৬)

বাংলা অর্থঃ –অসৎ বস্তুর ভাব (অস্তিত্ব) নেই এবং সৎ বস্তুর অনস্তিত্ব নেই। তত্ত্বদর্শী মহাপুরুষগণ এই দুটিরই পরিণতি অর্থাৎ এ দুটিকে তত্ত্বত দেখেছেন অর্থাৎ অনুভব করেছেন।- (স্বামী রামসুখদাস-১৬)

অবিনাশি তু তদ্‌বিদ্ধি যেন সর্বমিদং ততম্‌।

বিনাশমব্যয়স্যাস্য ন কশ্চিৎ কর্তুমর্হতি।।১৭

সরলার্থঃ যিনি এই সকল (দৃশ্য জগৎ) ব্যাপিয়া আছেন তাঁহাকে অবিনাশী জানিও। কেহই এই অব্যয় স্বরূপের বিনাশ করিতে পারে না।- (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-১৭)

অনুবাদঃ যা সমগ্র শরীরে পরিব্যাপ্ত হয়ে রয়েছে, তাকে তুমি অবিনাশী বলে জানবে। সেই অব্যয় আত্মাকে কেউ বিনাশ করতে সক্ষম নয়।- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-১৭)

বাংলা অর্থঃ অবিনাশী বলে তাঁকেই জানাবে, যিনি এই সমস্ত জগৎ পরিব্যাপ্ত করে আছেন। এই অবিনাশীর বিনাশ কেউই করতে পারে না।- (স্বামী রামসুখদাস-১৭)

অন্তবন্ত ইমে দেহা নিত্যস্যোক্তাঃ শরীরিণঃ।

অনাশিনোহপ্রমেয়স্য তস্মাদ্‌ যুধ্যস্ব ভারত।।১৮

সরলার্থঃ দেহাশ্রিত আত্মার এই সকল দেহ নশ্বর বলিয়া উক্ত হইয়াছে। (কিন্তু) আত্মা নিত্য, অবিনাশী, অপ্রমেয় (স্বপ্রকাশ)। অতএব, হে অর্জুন, যুদ্ধ কর (আত্মার অবিনাশিতা ও দেহাদির নশ্বরত্ব স্মরণ করিয়া কাতরতা ত্যাগ কর। স্বধর্ম পালন কর)।- (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-১৮)

অনুবাদঃ অবিনাশী, অপরিমেয় ও শাশ্বত আত্মার জড় দেহ নিঃসন্দেহে বিনাশশীল। অতএব হে ভারত! তুমি শাস্ত্রবিহিত স্বধর্ম পরিত্যাগ না করে যুদ্ধ কর।- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-১৮)

বাংলা অর্থঃ অবিনাশী, অপ্রমেয় এবং নিত্যস্থিত শরীরীর (জীবাত্মার) আশ্রিত এই দেহকে নশ্বর বলা হয়েছে। অতএব হে অর্জুন! তুমি যুদ্ধ করো (স্বধর্মের পালন করো)।- (স্বামী রামসুখদাস-১৮)

য এনং বেত্তি হন্তারং যশ্চৈনং মন্যতে হতম্‌।

উভৌ তৌ ন বিজানীতো নায়ং হন্তি ন হন্যতে।।১৯

সরলার্থঃ যে আত্মাকে হন্তা বলিয়া জানে এবং যে উহাকে হত বলিয়া মনে করে, তাহারা উভয়েই আত্মতত্ত্ব জানে না। ইনি হত্যা করেন না, হতও হন না।- (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-১৯)

অনুবাদঃ যিনি জীবাত্মাকে হন্তা বলে মনে করেন কিংবা যিনি একে নিহত বলে ভাবেন, তাঁরা উভয়েই আত্মার প্রকৃত স্বরূপ জানেন না। কারণ আত্মা কাউকে হত্যা করেন না এবং কারও দ্বারা নিহতও হন না।- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-১৯)

বাংলা অর্থঃ যে ব্যক্তি এই অবিনাশী শরীরীকে হত্যাকারী বলে মনে করে এবং যে ব্যক্তি একে নিহত বলে জানে, তারা উভয়েই একে জানে না কারণ ইনি হত্যা করেন না বা হত হন না।- (স্বামী রামসুখদাস-১৯)

ন জায়তে ম্রিয়তে বা কদাচিৎ নায়ং ভূত্বা ভবিতা বা ন ভূয়ঃ।

অজো নিত্যঃ শাশ্বতোহয়ং পুরাণো

ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে।।২০

সরলার্থঃ এই আত্মা কখনও জন্মেন না বা মরেন না। ইনি অন্যান্য জাত বস্তুর ন্যায় জন্মিয়া অস্তিত্ব লাভ করেন না অর্থাৎ ইনি সৎরূপে নিত্য বিদ্যমান। ইনি জন্মরহিত, নিত্য, শাশ্বত এবং পুরাণ; শরীর হত হইলেও ইনি হত হন না।- (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-২০)

অনুবাদঃ আত্মার কখনও জন্ম হয় না বা মৃত্যু হয়না, অথবা পুনঃ পুনঃ তাঁর উৎপত্তি বা বৃদ্ধি হয় না। তিনি জন্মরহিত, শাশ্বত, নিত্য এবং পুরাতন হলেও চিরনবীন। শরীর নষ্ট হলেও আত্মা কখনও বিনষ্ট হয় না।- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-২০)

বাংলা অর্থঃ এই জীবাত্মা কখনো জাত বা মৃত হন না। ইনি জন্ম নিয়ে অস্তিত্ব লাভ। করেন না (অর্থাৎ ইনি নিত্য বিদ্যমান)। ইনি জন্মরহিত, নিত্য শাশ্বত এবং প্রাচীন (অনাদি)। শরীর বিনাশপ্রাপ্ত হলেও ইনি হত হন না।- (স্বামী রামসুখদাস-২০)

বেদাবিনাশিনং নিত্যং য এনমজমব্যয়ম্‌।

কথং স পুরুষঃ পার্থ কং ঘাতয়তি হন্তি কম্‌।২১

সরলার্থঃ যিনি আত্মাকে অবিনাশী, নিত্য, অজ, অব্যয় বলিয়া জানেন, হে পার্থ, সে পুরুষ কি প্রকারে কাহাকে হত্যা করেন বা করান?- (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-২১)

অনুবাদঃ হে পার্থ! যিনি এই আত্মাকে অবিনাশী, শাশ্বত, জন্মরহিত ও অক্ষয় বলে জানেন, তিনি কিভাবে কাউকে হত্যা করতে বা হত্যা করাতে পারেন?- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-২১)

বাংলা অর্থঃ হে পৃথানন্দন! যে ব্যক্তি এই শরীরীকে (জীবাত্মাকে) অবিনাশী, নিত্য, জন্মরহিত এবং অব্যয় বলে জানেন, তিনি কীভাবে কাকে হত্যা করবেন বা হত্যা করাবেন।- (স্বামী রামসুখদাস-২১)

বাসাংসি জীর্ণানি যথা বিহায় নবানি গৃহ্নাতি নরোহপরাণি।

তথা শরীরাণি বিহায় জীর্ণান্যন্যানি সংযাতি নবানি দেহী।।২২

সরলার্থঃ যেমন মনুষ্য জীর্ণ বস্ত্র পরিত্যাগ করিয়া নূতন বস্ত্র গ্রহণ করে, সেইরূপ আত্মা জীর্ণ শরীর পরিত্যাগ করিয়া অন্য নূতন শরীর পরিগ্রহ করে।- (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-২২)

অনুবাদঃ মানুষ যেমন জীর্ণ বস্ত্র পরিত্যাগ করে নতুন বস্ত্র পরিধান করে, দেহীও তেমনই জীর্ণ শরীর ত্যাগ করে নতুন দেহ ধারণ করেন।- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-২২)

বাংলা অর্থঃ যেমন মানুষ পুরাতন বস্ত্র পরিত্যাগ করে অন্য নতুন বস্ত্র গ্রহণ করে, সেইরূপ দেহীও পুরাতন (জীর্ণ) শরীর পরিত্যাগ করে অন্য নতুন শরীর পরিগ্রহ করে।- (স্বামী রামসুখদাস-২২)

নৈনং ছিন্দন্তি শাস্ত্রাণি নৈনং দহতি পাবকঃ।

ন চৈনং ক্লেদয়ন্ত্যাপো ন শোষয়তি মারুতঃ।।২৩

সরলার্থঃ শস্ত্রসকল ইহাকে ছেদন করিতে পারে না, অগ্নিতে দহন করিতে পারে না, জলে ভিজাইতে পারে না।- (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-২৩)

অনুবাদঃ আত্মাকে অস্ত্রের দ্বারা কাটা যায় না, আগুনে পোড়ানো যায় না, জলে ভেজানো যায় না, অথবা হাওয়াতে শুকানোও যায় না।- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-২৩)

বাংলা অর্থঃ শাস্ত্র দ্বারা এই শরীরীকে (জীবাত্মাকে) ছেদন করা যায় না, অগ্নি একে দহন করতে পারে না, জল একে সিক্ত করতে পারে না এবং বায়ু একে শুষ্ক করতে পারে না।- (স্বামী রামসুখদাস-২৩)

অচ্ছেদ্যোহয়মদাহ্যোহয়মক্লেদ্যোহশোষ্য এব চ।

নিত্যঃ সর্বগতঃ স্থাণুরচলোহয়ং সনাতনঃ।।২৪

সরলার্থঃ এই আত্মা অচ্ছেদ্য, অদাহ্য, অক্লেদ্য, অশোষ্য। ইনি নিত্য, সর্বব্যাপী, স্থির, অচল, সনাতন, অব্যক্ত, অচিন্ত্য, অবিকার্য বলিয়া কথিত হন।- (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-২৪)

অনুবাদঃ এই আত্মা অচ্ছেদ্য, অদাহ্য, অক্লেদ্য ও অশোষ্য। তিনি চিরস্থায়ী, সর্বব্যাপ্ত, অপরিবর্তনীয়, অচল ও সনাতন।- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-২৪)

বাংলা অর্থঃ জীবাত্মাকে খণ্ড করা যায় না, দগ্ধ করা যায় না, সিক্ত করা যায় না এবং শুষ্ক করা যায় না। কারণ জীবাত্মা নিত্য, সর্বব্যাপী, অচল স্থিরস্বভাবসম্পন্ন এবং অনাদি।- (স্বামী রামসুখদাস-২৪)

অব্যক্তোহয়মচিন্ত্যোহয়মবিকার্যোহয়মুচ্যতে।

তস্মাদেবং বিদিত্বৈনং নানুশোচিতুমর্হসি।।২৫

সরলার্থঃ অতএব আত্মাকে এই প্রকার জানিয়া তোমার শোক করা উচিত নয়।- (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-২৫)

অনুবাদঃ এই আত্মা অব্যক্ত, অচিন্ত্য ও অবিকারী বলে শাস্ত্রে উক্ত হয়েছে। অতএব এই সনাতন স্বরূপ অবগত হয়ে দেহের জন্য তোমার শোক করা উচিত নয়।- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-২৫)

বাংলা অর্থঃ এই দেহী প্রত্যক্ষ গোচরীভূত নয়, এটি চিন্তা করার বিষয় নয় এবং এটি সর্বপ্রকার বিকাররহিত। অতএব দেহী অর্থাৎ জীবাত্মাকে এইরূপ জেনে তোমার শোক করা উচিত নয়।- (স্বামী রামসুখদাস-২৫)

অতচৈনং নিত্যজাতং নিত্যং বা মন্যসে মৃতম্‌।

তথাপি ত্বং মহাবাহো নৈনং শোচিতুমর্হসি।।২৬

সরলার্থঃ দেহনাশে আত্মারও নাশ হয় ইহা স্বীকার করিয়া লইলেও শোক করা উচিত নয়। কেননা, জন্মমৃত্যু অবশ্যম্ভাবী।- (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-২৬)

অনুবাদঃ হে মহাবাহো! আর যদি তুমি মনে কর যে, আত্মার বারবার জন্ম হয় এবং মৃত্যু হয়, তা হলেও তোমার শোক করার কোন কারণ নেই।- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-২৬)

বাংলা অর্থঃ হে মহাবাহো! যদি তুমি মনে কর যে এই জীবাত্মা সর্বদা জন্মায় এবং মৃত্যুমুখে পতিত হয়, তাহলেও তোমার এর জন্য শোক করা উচিত নয়।- (স্বামী রামসুখদাস-২৬)

জাতস্য হি ধ্রুবো মৃত্যুর্ধ্রুবং জন্ম মৃতস্য চ।

তস্মাদপরিহার্যেহর্থে ন ত্বং শোচিতুমর্হসি।।২৭

সরলার্থঃ যে জন্মে তাহার মরণ নিশ্চিত, যে মরে তাহার জন্ম নিশ্চিত; সুতরাং অবশ্যম্ভাবী বিষয়ে তোমার শোক করা উচিত নয়।- (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-২৭)

অনুবাদঃ যার জন্ম হয়েছে তার মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী এবং যার মৃত্যু হয়েছে তার জন্মও অবশ্যম্ভাবী। অতএব অপরিহার্য কর্তব্য সম্পাদন করার সময় তোমার শোক করা উচিত নয়।- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-২৭)

বাংলা অর্থঃ যে জন্মায় তার মৃত্যু নিশ্চিত এবং যে মরে তার জন্মও নিশ্চিত, এর (জন্ম-মৃত্যুর প্রবাহের) পরিহার অর্থাৎ নিবারণ হওয়া সম্ভব নয়। সুতরাং এই বিষয় নিয়ে তোমার শোক করা উচিত নয়।- (স্বামী রামসুখদাস-২৭)

অব্যক্তাদীনি ভূতানি ব্যক্তমধ্যানি ভারত।

অব্যক্তনিধনান্যেব তত্র কা পরিদেবনা।।২৮

সরলার্থঃ ডে ভারত, (অর্জুন), জীবগণ আদিতে অব্যক্ত, মধ্যে ব্যক্ত এবং বিনাশান্তে অব্যক্ত থাকে। তাহাতে শোক বিলাপ কি?- (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-২৮)

অনুবাদঃ হে ভরত! সমস্ত সৃষ্ট জীব উৎপন্ন হওয়ার আগে অপ্রকাশিত ছিল, তাদের স্থিতিকালে প্রকাশিত থাকে এবং বিনাশের পর আবার অপ্রকাশিত হয়ে যায়। সুতরাং সেই জন্য শোক করার কি কারণ?- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-২৮)

বাংলা অর্থঃ হে ভারত! সকল প্রাণী জন্মের পূর্বে অপ্রকট ছিল এবং মৃত্যুর পরেও অপ্রকট হবে, কেবল মধ্যভাগে প্রকট বলে মনে হচ্ছে; সুতরাং এতে শোক কিসের?- (স্বামী রামসুখদাস-২৮)

আশ্চর্যবৎ পশ্যতি কশ্চিদেন-

মাশ্চর্যবদ্‌ বদতি তথৈব চান্যঃ।

আশ্চর্যবচ্চৈনমন্যঃ শৃণোতি

শ্রুত্বাপ্যেনং বেদ ন চৈব কশ্চিৎ।।২৯

সরলার্থঃ কেহ আত্মাকে আশ্চর্যবৎ কিছু বলিয়া বোধ করেন, কেহ ইহাকে আশ্চর্যবৎ কিছু বলিয়া বর্ণনা করেন, কেহ বা ইনি আশ্চর্যবৎ কিছু, এই প্রকার কথাই শুনেন। কিন্তু শুণিয়াও কেহ ইহাকে জানিতে পারেন না।- (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-২৯)

অনুবাদঃ কেউ এই আত্মাকে আশ্চর্যবৎ দর্শন করেন, কেউ আশ্চর্যভাবে বর্ণনা করেন এবং কেউ আশ্চর্য জ্ঞানে শ্রবণ করেন, আর কেউ শুনেও তাকে বুঝতে পারেন না।- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-২৯)

বাংলা অর্থঃ কেউ এই জীবাত্মাকে আশ্চর্যতুল্য দেখেন, কেই এই জীবাত্মাকে আশ্চর্যরূপে বর্ণনা করেন আবার অন্য কেউ একে আশ্চর্যরূপে শোনেন এবং এ বর্ণনা শুনেও কেউ একে ঠিকমতো জানেন না অর্থাৎ এটি দুর্বোধ্য।- (স্বামী রামসুখদাস-২৯)

দেহী নিত্যমবধ্যোহয়ং দেহে সর্বস্য ভারত।

তস্মাৎ সর্বাণি ভূতানি ন ত্বং শোচিতুমর্হসি।।৩০

সরলার্থঃ হে ভারত, জীবসকলের দেহ আত্মা সর্বদাই অবধ্য, অতএব কোন প্রাণীর জন্যই তোমার শোক করা উচিত নহে।- (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-৩০)

অনুবাদঃ হে ভারত! প্রাণীদের দেহে অবস্থিত আত্মা সর্বদাই অবধ্য। অতএব কোন জীবের জন্য তোমার শোক করা উচিত নয়।- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-৩০)

বাংলা অর্থঃ হে ভরতবংশোদ্ভব অর্জুন! জীবগণের দেহে এই দেহী সর্বদাই অবধ্য, সেই কারণে এই সমস্ত প্রাণীর জন্য অর্থাৎ কোনো প্রাণীর জন্যই তোমার শোক করা উচিত নয়।- (স্বামী রামসুখদাস-৩০)

স্বধর্মমপি চাবেক্ষ্য ন বিকম্পিতুমর্হসি।

ধর্ম্যাদ্ধি যুদ্ধাচ্ছ্রেয়োহন্যং ক্ষত্রিয়স্য ন বিদ্যতে।।৩১

সরলার্থঃ স্বধর্মের দিকে দৃষ্টি রাখিয়াও তোমার ভীত-কম্পিত হওয়া উচিত নহে। ধর্ম্যযুদ্ধ অপেক্ষা ক্ষত্রিয়ের পক্ষে শ্রেয়ঃ আর কিছু নাই।- (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-৩১)

অনুবাদঃ ক্ষত্রিয়রূপে তোমার স্বধর্ম বিবেচনা করে তোমার জানা উচিত যে, ধর্ম রক্ষার্থে যুদ্ধ করার থেকে ক্ষত্রিয়ের পক্ষে মঙ্গলকর আর কিছুই নেই। তাই, তোমার দ্বিধাগ্রস্থ হওয়া উচিত নয়।- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-৩১)

বাংলা অর্থঃ স্বধর্মের দিকে লক্ষ রেখেই তোমার শিহরিত হওয়া অর্থাৎ কর্তব্যকর্ম হতে বিচলিত হওয়া উচিত নয়; কারণ ক্ষত্রিয়ের পক্ষে ধর্মযুদ্ধ অপেক্ষা আর কিছুই কল্যাণকারী কর্ম নেই।- (স্বামী রামসুখদাস-৩১)

যদৃচ্ছয় চোপপন্নং স্বর্গদ্বারমপাবৃতম্‌।

সুখিনঃ ক্ষত্রিয়াঃ পার্থ লভন্তে যুদ্ধমীদৃশম্‌।।৩২

সরলার্থঃ হে পার্থ, এই যুদ্ধ আপনা হইতেই উপস্থিত হইয়াছে, ইহা মুক্ত স্বর্গদ্বার স্বরূপ। ভাগ্যবান্‌ ক্ষত্রিয়েরাই ঈদৃশ যুদ্ধ লাভ করিয়া থাকেন।- (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-৩২)

অনুবাদঃ হে পার্থ! স্বর্গদ্বার উন্মোচনকারী এই প্রকার ধর্মযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার সুযোগ না চাইতেই যে সব ক্ষত্রিয়ের কাছে আসে, তাঁরা সুখী হন।- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-৩২)

বাংলা অর্থঃ –আপনা হতে প্রাপ্ত এই যুদ্ধ মুক্ত স্বর্গদ্বারস্বরূপ। হে পার্থ, ভাগ্যবান ক্ষত্রিয়গণই এইরূপ যুদ্ধ লাভ করে থাকেন।- (স্বামী রামসুখদাস-৩২)

অথ চেত্ত্বমিমং ধর্ম্যং সংগ্রামং ন করিষ্যসি।

ততঃ স্বধর্মং কীর্তিং চ হিত্বা পাপমবাপ্স্যসি।।৩৩

সরলার্থঃ আর যদি তুমি ধর্ম্যযুদ্ধ না কর, তবে স্বধর্ম ও কীর্তি ত্যাগ করিয়া তুমি পাপযুক্ত হইবে।- (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-৩৩)

অনুবাদঃ কিন্তু, তুমি যদি এই ধর্মযুদ্ধ না কর, তা হলে তোমার স্বীয় ধর্ম এবং কীর্তি থেকে ভ্রষ্ট হয়ে পাপ ভোগ করবে।- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-৩৩)

বাংলা অর্থঃ আর যদি তুমি এই ধর্মযুদ্ধ না কর, তাহলে স্বধর্ম ও কীর্তি ত্যাগ করে পাপের ভাগী হবে।- (স্বামী রামসুখদাস-৩৩)

অকীর্ত্তিঞ্চাপি ভূতানি কথায়িষ্যন্তি তেহব্যয়াম্‌।

সম্ভাবিতস্য চাকীর্তির্মরণাদতিরিচ্যতে।।৩৪

সরলার্থঃ আরও দেখ, সকল লোকে চিরকাল তোমার অকীর্তি ঘোষণা করিবে। সম্মাণিত ব্যক্তির পক্ষে অকীর্তি মরণ অপেক্ষাও অধিক, অর্থাৎ অকীর্তি অপেক্ষা মরণও শ্রেয়ঃ।- (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-৩৪)

অনুবাদঃ সমস্ত লোক তোমার কীর্তিহীনতার কথা বলবে এবং যে কোন মর্যাদাবার লোকের পক্ষেই এই অসম্মান মৃত্যু অপেক্ষাও অধিকতর মন্দ।- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-৩৪)

বাংলা অর্থঃ সকল প্রাণী চিরকাল তোমার অকীর্তির কথা কলতে থাকবে। এই অকীর্তি সম্মানিত ব্যক্তির পক্ষে মৃত্যুর থেকেও দুঃখদায়ক হয়।- (স্বামী রামসুখদাস-৩৪)

ভয়াদ্রণাদুপরতং মংস্যন্তে ত্বাং মহারথাঃ।

যেষাঞ্চ ত্বং বহুমতো ভূত্বা যাস্যসি লাঘবম্‌।।৩৫

সরলার্থঃ মহারথগণ মনে করিবেন, তুমি ভয়বশতঃ যুদ্ধে বিরত হইতেছ, (দয়াবশতঃ নহে)। সুতরাং যাঁহারা তোমাকে বহু সম্মান করেন, তাঁহাদিগকে নিকট তুমি লঘূতা প্রাপ্ত হইবে।- (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-৩৫)

অনুবাদঃ সমস্ত মহারথীরা মনে করবেন যে, তুমি ভয় পেয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিত্যাগ করেছ এবং তুমি যাদের কাছে সম্মানিত ছিলে, তারাই তোমাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য জ্ঞান করবে।- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-৩৫)

বাংলা অর্থঃ মহারথিগণ মনে করবেন যে ভয়বশত তুমি যুদ্ধে বিরত হচ্ছ। যাঁদের ধারণায় তুমি বহুজনমান্য ব্যক্তি হয়েছিলে, তাঁদের দৃষ্টিতে তুমি লঘুত্ব প্রাপ্ত হবে।- (স্বামী রামসুখদাস-৩৫)

অবাচ্যবাদাংশ্চ বহূন্‌ বদিষ্যন্তি তবাহিতাঃ।

নিন্দন্তস্তব সামর্থ্যং ততো দুঃখতরং নু কিম্‌।।৩৬

সরলার্থঃ তোমার শত্রুরাও তোমার সামর্থ্যের নিন্দা করিয়া অনেক অবাচ্য কথা বলিবে; তাহা অপেক্ষা অধিক দুঃখকর আর কি আছে?- (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-৩৬)

অনুবাদঃ তোমার শত্রুরা তোমার সামর্থ্যের নিন্দা করে বহু অকথ্য কথা বলবে। তার চেয়ে অধিকতর দুঃখদায়ক তোমার পক্ষে আর কি হতে পারে?- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-৩৬)

বাংলা অর্থঃ –তোমার শত্রুগণ তোমার সামর্থ্যের নিন্দ করে অনেক অকথ্য বাক্য বলবে। এর থেকে বড় দুঃখ আর কিসে হতে পারে?- (স্বামী রামসুখদাস-৩৬)

হতো বা প্রাপ্স্যসি স্বর্গং জিত্বা বা ভোক্ষ্যসে মহীম্‌।

তস্মাদুত্তিষ্ঠ কৌন্তেয় যুদ্ধায় কৃতনিশ্চয়ঃ।।৩৭

সরলার্থঃ যুদ্ধে হত হইলে স্বর্গ পাইবে, জয়লাভ করিলে পৃথিবী ভোগ করিবে, সুতরাং হে কৌন্তেয়, যুদ্ধে কৃতনিশ্চত হইয়া উত্থান কর।- (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-৩৭)

অনুবাদঃ হে কুন্তীপুত্র! এই যুদ্ধে নিহত হলে তুমি স্বর্গ লাভ করবে, আর জয়ী হলে পৃথিবী ভোগ করবে। অতএব যুদ্ধের জন্য দৃঢ়সঙ্কল্প হয়ে উত্থিত হও।- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-৩৭)

বাংলা অর্থঃ যুদ্ধে যদি তোমার মৃত্যুও হয় তবে তোমার স্বর্গপ্রাপ্তি হবে। আর যদি যুদ্ধে জয়লাভ কর তবে পৃথিবীর রাজত্ব ভোগ করবে। অতএব হে কুন্তীনন্দন! তুমি যুদ্ধের জন্য স্থির নিশ্চয় হয়ে প্রস্তুত হও।- (স্বামী রামসুখদাস-৩৭)

সুখসুঃখে সমে কৃত্বা লাভালাভৌ জয়াজয়ৌ।

ততো যুদ্ধায় যুজ্যস্ব নৈবং পাপমবাপ্স্যসি।।৩৮

সরলার্থঃ অতএব সুখদুঃখ, লাভ-অলাভ, জয়-পরাজয়, তুল্যজ্ঞান করিয়া যুদ্ধার্থ উদ্‌যুক্ত হও। এইরূপ করিলে পাপভাগী হইবে না।- (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-৩৮)

অনুবাদঃ সুখ-দুঃখ, লাভ-ক্ষতি ও জয়-পরাজয়কে সমান জ্ঞান করে তুমি যুদ্ধের নিমিত্ত যুদ্ধ কর, তা হলে তোমাকে পাপভাগী হতে হবে না।- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-৩৮)

বাংলা অর্থঃ জয়-পরাজয়, লাভ-ক্ষতি, সুখ-দুঃখকে সমান (জ্ঞান) করে যুদ্ধে অবতীর্ণ হও। এইরূপে যুদ্ধ করলে তুমি পাপভাগী হবে না।- (স্বামী রামসুখদাস-৩৮)

এষা তেহভিহিতা সাংখ্যে বুদ্ধির্যোগে ত্বিমাং শৃণু।

বুদ্ধ্যা যুক্তো যয়া পার্থ কর্মবন্ধং প্রহাস্যসি।।৩৯

সরলার্থঃ হে পার্থ, তোমাকে এতক্ষণ সাংখ্যনিষ্ঠা-বিষয়ক জ্ঞান উপদেশ দিলাম, এক্ষণ যোগবিষয়ক জ্ঞান শ্রবণ কর (যাহা এক্ষণ বলিতেছি); এই জ্ঞান লাভ করিলে কর্মবন্ধন ত্যাগ করিতে পারিবে।- (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-৩৯)

অনুবাদঃ হে পার্থ! আমি তোমাকে সাংখ্য-যোগের কথা বললাম। এখন ভক্তিযোগ সম্বন্ধিনী যুদ্ধির কথা শ্রবণ কর, যার দ্বারা তুমি কর্মবন্ধন থেকে মুক্ত হতে পারবে।- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-৩৯)

বাংলা অর্থঃ হে পার্থ! এই সমবুদ্ধির কথা প্রথমে সাংখ্যযোগে বলা হয়েছে, এখন তুমি এ সম্বন্ধে কর্মযোগের মাধ্যমে শ্রবণ কর। এই সমবুদ্ধিযুক্ত হলে তুমি কর্মবন্ধন ত্যাগ করতে পারবে।- (স্বামী রামসুখদাস-৩৯)

নেহাভিক্রমনাশোহস্তি প্রত্যবায়ো ন বিদ্যতে।

স্বল্পমপ্যস্য ধর্মস্য ত্রায়তে মহতো ভয়াৎ।।৪০

সরলার্থঃ ইহাতে (নিষ্কাম কর্মযোগে) আরব্ধ কর্ম নিষ্ফল হয় না এবং (ক্রুটি-বিচ্যুতি-জনিত) পাপ বা বিঘ্ন হয় না, এই ধর্মের অল্প আচরণও মহাভয় হইতে ত্রাণ করে।- (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-৪০)

অনুবাদঃ ভক্তিযোগের অনুশীলন কখনও ব্যর্থ হয় না এবং তার কোনও ক্ষয় নেই। তার স্বল্প অনুষ্ঠানও অনুষ্ঠাতাকে সংসাররূপ মহাভয় থেকে পরিত্রাণ করে।- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-৪০)

বাংলা অর্থঃ জগতে এই সমবুদ্ধিরূপ ধর্মের প্রচেষ্টা নষ্ট হয় না, এই কর্মের কোনো বিপরীত ফলও হয় না এবং এই ধর্মের অল্প আচরণও (জন্ম-মৃত্যুরূপ) মহাভয় হতে রক্ষা করে।- (স্বামী রামসুখদাস-৪০)

ব্যবসায়াত্মিকা বুদ্ধিরেকেহ কুরুনন্দন।

বহুশাখা হ্য্নন্তাশ্চ বুদ্ধয়োহব্যবসায়িনাম্‌।।৪১

সরলার্থঃ ইহাতে (এই নিষ্কাম কর্মযোগে) ব্যবসায়াত্মিকা বুদ্ধি (নিষ্কাম ভাবে কর্ম করিয়াই ত্রাণ পাইব এইরূপ নিশ্চয়াত্মিকা বুদ্ধি) একই হয় অর্থাৎ একনিষ্ঠ থাকে, নানাদিকে ধাবিত হয় না। কিন্তু অব্যবসায়ীদিগের (অস্থিরচিত্ত সকাম ব্যক্তিগণের) বুদ্ধি বহুশাখাবিশিষ্ট ও অনন্ত (সুতরাং নানাদিকে ধাবিত হয়)।- (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-৪১)

অনুবাদঃ যারা এই পথ অবলম্বন করেছে তাদের নিশ্চয়াত্মিকা বুদ্ধি একনিষ্ঠ। হে কুরুনন্দন, অস্থিরচিত্ত সকাম ব্যক্তিদের বুদ্ধি বহু শাখাবিশিষ্ট ও বহুমুখী।- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-৪১)

বাংলা অর্থঃ –হে কুরুনন্দন! এই সমবুদ্ধিপ্রাপ্তির বিষয়ে ব্যবসায়াত্মিক (নিশ্চয়াত্মিকা) বুদ্ধি একই থাকে। অব্যবসায়ী (অস্থিরচিত্ত) মানুষদের বুদ্ধি অনন্ত এবং বহুশাখাযুক্ত হয়ে থাকে।- (স্বামী রামসুখদাস-৪১)

যামিমাং পুষ্পিতাং বাচং প্রবদন্ত্যবিপশ্চিতাঃ।

বেদবাদরতাঃ পার্থ নান্যদন্তীতি বাদিনঃ।।৪২

কামাত্মানঃ স্বর্গপরা জন্মকর্মফলপ্রদাম্‌।

ক্রিয়াবিশেষবহুলাং ভোগৈশ্বর্যগতিং প্রতি।।৪৩

ভোগৈশ্বর্যপ্রসক্তানাং তয়াপহৃতচেতসাম্‌।

ব্যবসায়াত্মিকা বুদ্ধিঃ সমাধৌ ন বিধীয়তে।।৪৪

সরলার্থঃ হে পার্থ, অল্পবুদ্ধি ব্যক্তিগণ বেদের কর্মকাণ্ডের স্বর্গফলাদি প্রকাশক প্রীতিকর বাক্যে অনুরক্ত, তাহারা বলে বেদোক্ত কাম্য-কর্মাত্মক ধর্ম ভিন্ন আর কিছু ধর্ম নাই, তাহাদের চিত্ত কামনা-কলুষিত, স্বর্গই তাহাদের পরম পুরুষার্থ, তাহারা ভোগৈশ্বর্য লাভের উপায় স্বরূপ বিবিধ ক্রিয়াকলাপের প্রশংসাসূচক আপাতমনোরম বেদবাক্য বলিয়া থাকে। এই সকল শ্রবণ-রমনীয় বাক্যদ্বারা অপহৃতচিত্ত, ভোগৈশ্বর্য আসক্ত ব্যক্তিগণের কার্যাকার্য-নির্ণায়ক বুদ্ধি এক বিষয়ে স্থির থাকিতে পারে না (ঈশ্বরে একনিষ্ঠ হয় না)।- (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-৪২-৪৪)

যামিমাং পুষ্পিতাং বাচং প্রবদন্ত্যবিপশ্চিতাঃ।

বেদবাদরতাঃ পার্থ নান্যদন্তীতি বাদিনঃ।।৪২

কামাত্মানঃ স্বর্গপরা জন্মকর্মফলপ্রদাম্‌।

ক্রিয়াবিশেষবহুলাং ভোগৈশ্বর্যগতিং প্রতি।।৪৩

অনুবাদঃ বিকেকবর্জিত লোকেরাই বেদের পুষ্পিত বাক্যে আসক্ত হয়ে স্বর্গসুখ ভোগ, উচ্চকুলে জন্ম, ক্ষমতা লাভ আদি সকাম, কর্মকেই জীবনের চরম উদ্দেশ্য বলে মনে করে। ইন্দ্রিয়সুখ ভোগ ও ঐশ্বর্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তারা বলে যে, তার ঊর্ধ্বে আর কিছুই নেই।- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-৪৩)

বাংলা অর্থঃ হে পৃথানন্দন! যারা কামনাতে মগ্ন হয়ে আছে, স্বর্গকেই যারা শ্রেষ্ঠ বলে মনে করে, বেদে কথিত সকাম কর্মে যারা প্রীতি রাখে, ‘ভোগ বিনা আর কিছুই নেই’- এমন কথা যারা বলে, এইরূপ বিবেকহীন ব্যক্তিগণ সেই প্রকার মনোহর (পুষ্পিত) বাক্যই বলে, যা জন্ম-মৃত্যুরূপ কর্মফল প্রদানকারী এবং ভোগ-ঐশ্বর্যপ্রাপ্তির উপায়স্বরূপ নানাপ্রকার ক্রিয়াকর্মের বর্ণনাসূচক।- (স্বামী রামসুখদাস-৪৩)

ভোগৈশ্বর্যপ্রসক্তানাং তয়াপহৃতচেতসাম্‌।

ব্যবসায়াত্মিকা বুদ্ধিঃ সমাধৌ ন বিধীয়তে।।৪৪

অনুবাদঃ যারা ভোগ ও ঐশ্বর্যসুখে একান্ত আসক্ত, সেই সমস্ত বিবেকবর্জিত মূঢ় ব্যক্তিদের বুদ্ধি সমাধি অর্থাৎ ভগবানে একনিষ্ঠতা লাভ হয় না।- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-৪৪)

বাংলা অর্থঃ এই সমস্ত আপাত প্রীতিপ্রদ বাক্যে যাদের চিত্ত মোহিত হয়েছে অর্থাৎ ভোগে আসক্ত হয়েছে সেইসব ব্যক্তিদের পরমাত্মায় নিশ্চয়াত্মিকা বুদ্ধি হতে পারে না।- (স্বামী রামসুখদাস-৪৪)

ত্রৈগুণ্যবিষয়া বেদা নিস্ত্রৈগুণ্যো ভবার্জুন।

নির্দ্বন্দ্বো নিত্যসত্ত্বস্থো নির্যোগক্ষেম আত্মবান্‌।৪৫

সরলার্থঃ হে অর্জুন, বেদসমূহ ত্রৈগুণ্য-বিষয়ক, তুমি নিস্ত্রৈগুণ্য হও-তুমি নির্দ্বন্দ্ব, নিত্যসত্ত্বস্থ, যোগ-ক্ষেমরহিত ও আত্মবান্‌ হও।- (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-৪৫)

অনুবাদঃ বেদে প্রধানত জড়া প্রকৃতির তিনটি গুণ সম্বন্ধেই আলোচনা করা হয়েছে। হে অর্জুন! তুমি সেই গুণগুলিলে অতিক্রম করে নির্গুণ স্তরে অধিষ্ঠিত হও। সমস্ত দ্বন্দ্ব থেকে মুক্ত হও এবং লাভ-ক্ষতি ও আত্মরক্ষার দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত হয়ে অধ্যাত্ম চেতনায় অধিষ্ঠিত হও।- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-৪৫)

বাংলা অর্থঃ বেদসমূহ গুণত্রয়ের কার্যগুলির বর্ণনাকারক, হে অর্জুন! তুমি নিস্ত্রৈগুণ্য হও, নির্দ্বন্দ্ব হও, নিত্যসত্ত্বস্থ হও, যোগক্ষেমরহিত হও এবং পরমাত্মাপরায়ণ হও।- (স্বামী রামসুখদাস-৪৫)

যাবানর্থ উদপানে সর্বতঃ সংপ্লুতোদকে।

তাবান্‌ সর্বেষু বেদেষু ব্রাহ্মণস্য বিজানতঃ।।৪৬

সরলার্থঃ – ব্যাপীকূপতড়াগাদি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জলাশয়ে যে প্রয়োজন সিদ্ধ হয়, এক বিস্তীর্ণ মহাজলাশয়ে সেই সমস্তই সিদ্ধ হয়; সেইরূপ বেদোক্ত কাম্যকর্মসমূহে যে ফল লাভ হয়, ব্রহ্মবেত্তা ব্রহ্মনিষ্ঠ পুরুষের সেই সমস্তই লাভ হয়। (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-৪৬)

অনুবাদঃ ক্ষুদ্র জলাশয়ে যে সমস্ত প্রয়োজন সাধিত হয়ে, সেগুলি বৃহৎ জলাশয় থেকে আপনা হতেই সাধিত হয়ে যায়। তেমনই, ভগবানের উপাসনার মাধ্যমে যিনি পরব্রহ্মের জ্ঞান লাভ করে সব কিছুর উদ্দেশ্য উপলব্ধি করেছেন, তাঁর কাছে সমস্ত বেদের উদ্দেশ্য সাধিত হয়েছে।- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-৪৬)

বাংলা অর্থঃ এক বিস্তীর্ণ মহা জলাশয় প্রাপ্ত হলে ক্ষুদ্র জলাশয়ে মানুষের যে প্রয়োজন, অর্থাৎ কোনো প্রয়োজন সিদ্ধ হয় না, বেদ এবং শাস্ত্রের তত্ত্বজ্ঞ ব্রহ্মনিষ্ঠ পুরুষেরও বেদে ততটাই প্রয়োজন অর্থাৎ কোনো প্রয়োজনই থাকে না।- (স্বামী রামসুখদাস-৪৬)

কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন।

মা কর্মফলহেতুর্ভূর্মা তে সঙ্গোহস্ত্বকর্মণি।।৪৭

সরলার্থঃ – কর্মেই তোমার অধিকার, কর্মফলে কখনও তোমার অধিকার নেই। কর্মফল নে তোমার কর্মপ্রবৃত্তির হেতু না হয়, কর্মত্যাগেও নে তোমার প্রবৃত্তি না হয়। (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-৪৭)

অনুবাদঃ স্বধর্ম বিহিত কর্মে তোমার অধিকার আছে, কিন্তু কোন কর্মফলে তোমার অধিকার নেই। কখনও নিজেকে কর্মফলের হেতু বলে মনে করো না, এবং কখনও স্বধর্ম আচরণ না করার প্রতিও আসক্ত হয়ো না।- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-৪৭)

বাংলা অর্থঃ –কর্তব্যকর্মেই তোমার অধিকার, কর্মফলে কখনো অধিকার নেই; সুতরাং তুমি কর্মফলের হেতুও হোয়ো না এবং কর্মত্যাগেও যেন তোমার আসক্তি না হয়।- (স্বামী রামসুখদাস-৪৭)

যোগস্থঃ কুরু কর্মাণি সঙ্গং ত্যক্ত্বা ধনঞ্জয়।

সিদ্ধ্যসিদ্ধ্যোঃ সমো ভূত্বা সমত্বং যোগ উচ্যতে।।৪৮

সরলার্থঃ – হে ধনঞ্জয়, যোগস্থ হইয়া, ফলাসক্তি বর্জন করিয়া, সিদ্ধি ও অসিদ্ধি তুল্যজ্ঞান করিয়া তুমি কর্ম কর। এইরূপ সমত্ব-বুদ্ধিকেই যোগ কহে। (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-৪৮)

অনুবাদঃ হে অর্জুন! ফলভোগের কামনা পরিত্যাগ করে ভক্তিযোগস্থ হয়ে স্বধর্ম-বিহিত কর্ম আচরণ কর। কর্মের সিদ্ধি ও অসিদ্ধি সম্বন্ধে যে সমবুদ্ধি, তাকেই যোগ বলা হয়।- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-৪৮)

বাংলা অর্থঃ হে ধনঞ্জয়! তুমি ফলাসক্তি বর্জন করে, সিদ্ধি-অসিদ্ধিকে সমান জ্ঞান করে, যোগস্থ হয়ে কর্ম করো, কারণ এই সমত্বকেই যোগ বলা হয়।- (স্বামী রামসুখদাস-৪৮)

দূরেণ হ্যবরং কর্ম বুদ্ধিযোগাদ্‌ধনঞ্জয়।

বুদ্ধৌ শরণমন্বিচ্ছ কৃপণাঃ ফলহেতবঃ।।৪৯

সরলার্থঃ – হে ধনঞ্জয়, কেবল বাহ্যকর্ম বুদ্ধিযোগ অপেক্ষা নিতান্তই নিকৃষ্ট, অতএব তুমি সমত্ববুদ্ধির আশ্রয় লও; যাহারা ফলের উদ্দেশ্যে কর্ম করে, তাহারা দীন, কৃপার পাত্র। (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-৪৯)

অনুবাদঃ হে ধনঞ্জয়! বুদ্ধিযোগ দ্বারা ভক্তির অনুশীলন করে সকাম কর্ম থেকে দূরে থাক এবং সেই চেতনায় অধিষ্ঠিত হয়ে ভগবানের শরণাগত হও। যারা তাদের কর্মের ফল ভোগ করতে চায়, তারা কৃপণ।- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-৪৯)

বাংলা অর্থঃ বুদ্ধিযোগ (সমতা) অপেক্ষা সকাম কর্ম নিতান্তই নিকৃষ্ট। অতএব হে ধনঞ্জয়! তুমি সমবুদ্ধির আশ্রয় গ্রহণ করো। কারণ ফলের আশায় যারা কর্ম করে তারা অতি হীন।- (স্বামী রামসুখদাস-৪৯)

বুদ্ধিযুক্তো জহাতীহ উভে সুকৃতদুস্কৃতে।

তস্মাদ্‌ যোগায় যুজ্যস্ব যোগঃ কর্মসু কৌশলম্‌।।৫০

সরলার্থঃ – সমত্ববু্দ্ধিযুক্ত নিষ্কাম কর্মী ইহলোকেই সুকৃত দুষ্কত উভয়ই ত্যাগ করেন, সুতরাং তুমি যোগের অনুষ্ঠান কর, কর্মে কৌশলই যোগ। (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-৫০)

অনুবাদঃ যিনি ভগবদ্ভক্তির অনুশীলন করেন, তিনি এই জীবনেই পাপ ও পুণ্য উভয় থেকেই মুক্ত হন। অতএব, তুমি নিষ্কাম কর্মযোগের অনুষ্ঠান কর। সেটিই হচ্ছে সর্বাঙ্গীণ কর্মকৌশল।- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-৫০)

বাংলা অর্থঃ সমবুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তি ইহলোকে জীবিত অবস্থাতেই পাপ ও পুণ্য পরিত্যাগ করে। সুতরাং তুমি এই যোগ লাভে সচেষ্ট হও, কারণ যোগ প্রাপ্ত করাই হল কর্মে কুশলতা।- (স্বামী রামসুখদাস-৫০) 

কর্মজং বুদ্ধিযুক্তা হি ফলং ক্যক্ত্বা মনীষিণঃ।

জন্মবন্ধবিনির্মুক্তাঃ পদং গচ্ছন্ত্যনাময়ম্‌।।৫১

সরলার্থঃ – সমত্ববুদ্ধিযুক্ত জ্ঞানীগণ কর্ম করিলেও কর্মজনিত ফলে আবদ্ধ হন না, সুতরাং তাঁহার জন্মরূপ বন্ধন অর্থাৎ সংসার-বন্ধন হইতে মুক্ত হইয়া সর্বপ্রকার উপদ্রবরহিত বিষ্ণুপদ বা মোক্ষপদ প্রাপ্ত হন। (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-৫১)

অনুবাদঃ মনীষিগণ ভগবানের সেবায় যুক্ত হয়ে কর্মজাত ফল ত্যাগ করে জন্ম-মৃত্যুর বন্ধন থেকে মুক্ত হন। এভাবে তাঁরা সমস্ত দুঃখ-দুর্দশার অতীত অবস্থা লাভ করেন।- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-৫১)

বাংলা অর্থঃ সমতাযুক্ত বুদ্ধিমান সাধকগণ কর্মজনিত ফল ত্যাগ করে জন্মরূপ বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে নির্বিকার পদ-প্রাপ্ত হন।- (স্বামী রামসুখদাস-৫১)

যদা তে মোহকলিলং বুদ্ধির্ব্যতিতরিষ্যতি।

তদা গন্তাসি নির্বেদং শ্রোতব্যস্য শ্রুতস্য চ।।৫২

সরলার্থঃ – যখন তোমার বুদ্ধি মোহরূপ গহনকানন অতিক্রম করিবে, তখন তুমি শ্রুত ও শ্রোতব্য বিষয়ে বৈরাগ্য প্রাপ্ত হইবে। (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-৫২)

অনুবাদঃ এভাবে পরমেশ্বর ভগবানে অর্পিত নিষ্কাম কর্ম অভ্যাস করতে করতে যখন তোমার বুদ্ধি মোহরূপ গভীর অরণ্যকে সম্পূর্ণরূপে অতিক্রম করবে, তখন তুমি যা কিছু শুনছ এবং যা কিছু শ্রবণীয়, সেই সবের প্রতি সম্পূর্ণরূপে নিরপেক্ষ হতে পারবে।- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-৫২)

বাংলা অর্থঃ যখন তোমার বুদ্ধি মোহরূপ কর্দম অতিক্রম করবে, তখন তুমি শ্রুত ও শ্রোতব্য বিষয় ভোগ থেকে বৈরাগ্য লাভ করবে।- (স্বামী রামসুখদাস-৫২)

শ্রুতিবিপ্রতিপন্না তে যদা স্থাস্যতি নিশ্চলা।

সমাধাবচলা বুদ্ধিস্তদা যোগমবাপ্স্যসি।।৫৩

সরলার্থঃ – লৌকিক ও বৈদিক নানাবিধ ফলকথা শ্রবণে বিক্ষিপ্ত তোমার বুদ্ধি যখন সমাধিতে নিশ্চল হইয়া থাকিবে তখন তুমি (সাম্যবুদ্ধিরূপ) যোগ প্রাপ্ত হইবে। (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-৫৩)

অনুবাদঃ তোমার বুদ্ধি যখন বেদের বিচিত্র ভাষার দ্বারা আর বিচলিত হবে না এবং আত্ম-উপলব্ধির সমাধিতে স্থির হবে, তখন তুমি দিব্যজ্ঞান লাভ করে ভক্তিযোগে অধিষ্ঠিত হবে।- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-৫৩)

বাংলা অর্থঃ নানাপ্রকার শাস্ত্রীয় মতভেদে বিক্ষিপ্ত তোমার বুদ্ধি যখন নিশ্চল হয়ে যাবে এবং পরমাত্ময় অচলা হবে, সেই সময় তুমি যোগপ্রাপ্ত হবে।- (স্বামী রামসুখদাস-৫৩)

অর্জুন উবাচ

স্থিতপ্রজ্ঞস্য কা ভাষা সমাধিস্থস্য কেশব।

স্থিতধীঃ কিং প্রভাষেত কিমাসীত ব্রজেত কিম্‌।।৫৪

সরলার্থঃ অর্জুন কহিলেন- হে কেশব, যিনি সমাধিস্থ হইয়া স্থিতপ্রজ্ঞ হইয়াছেন তাঁহার লক্ষণ কি? স্থিতধী ব্যক্তি কিরূপ কথা বলেন? কিরূপে অবস্থান করেন? কিরূপে চলেন? – (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-৫৪)

অনুবাদঃ অর্জুন জিজ্ঞাসা করলেন- হে কেশব! স্থিতপ্রজ্ঞ অর্থাৎ অচলা বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের লক্ষণ কি? তিনি কিভাবে কথা বলেন, কিভাবে অবস্থান করেন এবং কিভাবেই বা তিনি বিচরণ করেন?- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-৫৪)

বাংলা অর্থঃ অর্জুন বললেন- হে কেশব! যিনি পরমাত্মায় স্থিত এবং স্থিতপ্রজ্ঞ, তাঁর লক্ষণ কী? সেই স্থিতধী ব্যক্তি কিরূপে কথা বলেন, কিরূপে অবস্থান করেন এবং কেমনভাবে বিচরণ করেন?- (স্বামী রামসুখদাস-৫৪)

শ্রীভগবান্‌ উবাচ

প্রজহাতি যদা কামান্‌ সর্বান্‌ পার্থ মনোগতান্‌।

আত্মন্যেবাত্মনা তুষ্টঃ স্থিতপ্রজ্ঞস্তদোচ্যতে।।৫৫

সরলার্থঃ শ্রীভগবান্‌ বলিলেন- হে পার্থ, যখন কেহ সমস্ত মনোগত কামনা বর্জন করিয়া আপনাতেই আপনি তুষ্ট থাকেনম তখন তিনি স্থিতপ্রজ্ঞ বলিয়া কথিত হন। – (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-৫৫)

অনুবাদঃ পরমেশ্বর ভগবান বললেন- হে পার্থ! জীব যখন মানসিক জল্পনা-কল্পনা থেকে উদ্ভূত সমস্ত মনোগত কাম পরিত্যাগ করে এবং তার মন যখন এভাবে পবিত্র হয়ে আত্মাতেই পূর্ণ পরিতৃপ্তি লাভ করে, তখনই তাকে স্থিতপ্রজ্ঞ বলা হয়।- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-৫৫)

বাংলা অর্থঃ শ্রীভগবান বললেন- হে পৃথানন্দন! যখন সাধক তাঁর সমস্ত মনোগত কামনা সম্পূর্ণভাবে পরিত্যাগ করে আপনাতেই আপনি সন্তুষ্ট থাকেন, তখন তাঁকে স্থিতপ্রজ্ঞ বলা হয়।- (স্বামী রামসুখদাস-৫৫)

দুঃখেষ্বনুদ্বিগ্নমনাঃ সুখেষু বিগতস্পৃহঃ।

বীতারাগভয়ক্রোধঃ স্থিতধীর্মুনিরুচ্যতে।।৫৬

সরলার্থঃ যিনি দুঃখে উদ্ধেগশূন্য, সুখে স্পৃহাশূন্য, যাঁহার অনুরাগ, ভয় এবং ক্রোধ নিবৃত্ত হইয়াছে, তাঁহাকে স্থিতপ্রজ্ঞ মুনি বলা যায়। – (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-৫৬)

অনুবাদঃ ত্রিতাপ দুঃখ উপস্থিত হলেও যাঁর মন উদ্বিগ্ন হয় না, সুখ উপস্থিত হলেও যাঁর স্পৃহা হয় না ওবং যিনি রাগ, ভয় ও ক্রোধ থেকে মুক্ত, তিনিই স্থিতধী অর্থাৎ স্থিতপ্রজ্ঞ।- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-৫৬)

বাংলা অর্থঃ দুঃখে যিনি উদ্বেগহীন, সুখে যিনি স্পৃহাশূন্য, যিনি সর্বতোভাবে আসক্তি, ভয় এবং ক্রোধরহিত হয়েছেন, সেই মননশীল ব্যক্তিকে স্থিতপ্রজ্ঞ বলা হয়।- (স্বামী রামসুখদাস-৫৬)

যঃ সর্বত্রাণভিস্নেহস্তত্তৎ প্রাপ্য শুভাশুভম্‌।

নাভিনন্দতি ন দ্বেষ্টি তস্য প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিতা।।৫৭

সরলার্থঃ যনি দেহ-জীবনাদি সকল বিষয়েই মমতাশূন্য, তত্তৎ বিষয়ে শুভ-প্রাপ্তিতে সন্তোষ বা অশুভ-প্রাপ্তিতে অসন্তোষ প্রকাশ করেন না, তিনিই স্থিতপ্রজ্ঞ। – (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-৫৭)

অনুবাদঃ জড় জগতে যিনি সমস্ত জড় বিষয়ে আসক্তি রহিত, যিনি প্রিয় বস্তু লাভে আনন্দিত হন না এবং অপ্রিয় বিষয় উপস্থিত হলে দ্বেষ করেন না, তিনি পূর্ণ জ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-৫৭)

বাংলা অর্থঃ সব বিষয়ে আসক্তিশূন্য হয়ে সেই সেই বিষয়ের শুভ-অশুভ প্রাপ্তিতে যিনি আনন্দিত ও অসন্তুষ্ট হন না, তিনিই স্থিপ্রজ্ঞ।- (স্বামী রামসুখদাস-৫৭)

যদা সংহরতে চায়ং কুর্মোহঙ্গানীব সর্বশঃ।

ইন্দ্রিয়াণীন্দ্রিয়ার্থেভ্যস্তস্য প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিতা।।৫৮

সরলার্থঃ বচ্ছপ মেন কর-চরণাদি অঙ্গসকল সঙ্কুচিত করিয়া রাখে, তেমনি যিনি রূপরসাদি ইন্দ্রিয়ের বিষয় হইতে ইন্দ্রিয়সকল সংহরণ করিয়া লন, তিনিই স্থিতপ্রজ্ঞ। – (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-৫৮)

অনুবাদঃ কূর্ম যেমন তার অঙ্গসমূহ তার কঠিন বহিরাবরণের মধ্যে সঙ্কুচিত করে, তেমনই যে ব্যক্তি তাঁর ইন্দ্রিয়গুলিকে ইন্দ্রিয়ের বিষয় থেকে প্রত্যাহর করে নিতে পারেন, তাঁর চেতনা চিন্ময় জ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত।- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-৫৮)

বাংলা অর্থঃ যেমন কচ্ছপ নিজ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে সর্বদিক থেকে সংকুচিত করে রাখে, তেমনি কর্মযোগীও ইন্দ্রিয়াদির বিষয়সমূহ থেকে ইন্দ্রিয়গুলিকে সর্বতোভাবে সংহরণ করে নেন (অপসারণ করে নেন), তখনই তাঁর বুদ্ধি প্রতিষ্ঠিত হয় (তখন তিনি স্থিতপ্রজ্ঞ হন)।- (স্বামী রামসুখদাস-৫৮)

বিষয়া বিনিবর্তন্তে নিরাহারস্য দেহিনঃ।

রসবর্জং রসোহপ্যস্য পরং দৃষ্ট্বা নিবর্ততে।।৫৯

সরলার্থঃ ইন্দ্রিয়দ্বারা বিষয়গ্রহণে অপ্রবৃত্ত ব্যক্তির বিষয়োপভোগ নিবৃত্ত হয় বটে, কিন্তু বিষয়-তৃষ্ণা নিবৃত্ত হয় না। কিন্তু সেই পরম পুরুষকে দেখিয়া স্থিতপ্রজ্ঞ ব্যক্তির বিষয়-বাসনা নিবৃত্ত হয়। – (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-৫৯)

অনুবাদঃ দেহবিশিষ্ট জীব ইন্দ্রিয়সুখ ভোগ থেকে নিবৃত্ত হতে পারে, কিন্তু তবুও ইন্দ্রিয়সুখ ভোগের আসক্তি থেকে যায়। কিন্তু উচ্চতর স্বাদ আস্বাদন করার ফলে তিনি সেই বিষয়তৃষ্ণা থেকে চিরতরে নিবৃত্ত হন।- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-৫৯)

বাংলা অর্থঃ অনাহারী (ইন্দ্রিয়গুলিকে বিষয় হতে প্রত্যাহারকারী) ব্যক্তির বিষয়ভোগ নিবৃত্ত হলেও তার (বিষয়) তৃষ্ণা নিবৃত্ত হয় না। কিন্তু পরমাত্মতত্ত্ব অনুভূত হওয়ার ফলে স্থিপ্রজ্ঞ ব্যক্তির বিষয়তৃষ্ণা নিবৃত্ত হয়ে যায় অর্থাৎ সংসারে তাঁর কোনো রসতৃষ্ণা থাকে না।- (স্বামী রামসুখদাস-৫৯)

যততো হ্যপি কৌন্তেয় পুরুষস্য বিপশ্চিতঃ।

ইন্দ্রিয়াণি প্রমাথীনি হরন্তি প্রসভং মনঃ।।৬০

সরলার্থঃ হে কৌন্তেয়, প্রমাথী ইন্দ্রিয়গণ সংযশে যত্নশীল, বিকেকী পুরুষেরও চিত্তকে বলপূর্বক হরণ করে (বিষয়াসক্ত করে)। – (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-৬০)

অনুবাদঃ হে কৌন্তেয়! ইন্দ্রিয়সমূহ এতই বলবান এবং ক্ষোভকারী যে, তারা অতি যত্নশীল বিবেকসম্পন্ন পুরুষের মনকেও বলপূর্বক বিষয়াভিমুখে আকর্ষণ করে।- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-৬০)

বাংলা অর্থঃ হে কুন্তীনন্দন! (রসতৃষ্ণা থাকলে) যত্নশীল বিকেকবান মানুষের প্রমথনশীল (চিত্তবিক্ষেপকারী) ইন্দ্রিয়গুলিও তার চিত্তকে বলপূর্বক হরণ করে।- (স্বামী রামসুখদাস-৬০)

তানি সর্বাণি সংযম্য যুক্ত আসীত মৎপরঃ।

বশে হি যস্যেন্দ্রিয়াণি তস্য প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিতা।।৬১

সরলার্থঃ যিনি আমার অনন্যভক্ত তিনি সেই সকল ইন্দ্রিয়কে সংযম করিয়া আমাতে চিত্ত সমাহিত করিয়া অবস্থান করেন। তাদৃশ সমাহিতচিত্ত ব্যক্তিরই ইন্দ্রিয়সকল বশীভূত হয়, তিনিই স্থিতপ্রজ্ঞ। – (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-৬১)

অনুবাদঃ যিনি তাঁর ইন্দ্রিয়গুলিকে সম্পূর্ণরূপে সংযত করে আমার প্রতি উত্তমা ভক্তিপরায়ণ হয়ে তাঁর ইন্দ্রিয়গুলিকে সম্পূর্ণরূপে বশীভূত করেছেন, তিনিই স্থিতপ্রজ্ঞ।- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-৬১)

বাংলা অর্থঃ কর্মযোগী সাধক সমস্ত ইন্দ্রিয় সংযত করে যেন আমাতে চিত্ত সমাহিত করে অবস্থান করে; কারণ যাঁর ইন্দ্রিয়গুলি সংযত, তাঁরই বুদ্ধি প্রতিষ্ঠিত (স্থিতপ্রজ্ঞ) বলা হয়।- (স্বামী রামসুখদাস-৬১)

ধ্যায়তো বিষয়ান্‌ পুংসঃ সঙ্গন্তেষুপজায়তো।

সঙ্গাৎ সঞ্জায়তে কামঃ কামাৎ ক্রোধোহভিজায়তে।।৬২

ক্রোধাদ্ভবতি সন্মোহঃ সম্মোহাৎ স্মৃতিবিভ্রমঃ।

স্মৃতিভ্রংশাদ্‌ বুদ্ধিনাশো বুদ্ধিনাশাৎ প্রণশ্যতি।।৬৩

সরলার্থঃ বিষয়-চিন্তা করিতে করিতে মনুষ্যের তাহাতে আসক্তি জন্মে, আসক্তি হইতে কামনা অর্থাৎ সেই বিষয় লাভের অভিলাষ জন্মে, সেই কামনা কোন কারণে প্রতিহত বা বাধাপ্রাপ্ত হইলে প্রতিরোধকের প্রতি ক্রোধ জন্মে, ক্রোধ হইতে মোহ, মোহ হইতে স্মৃতিভ্রংশ, স্মৃতিভংশ হইতে বুদ্ধিনাশ, বুদ্ধিনাশ হইতে বিনাশ, ঘটে। – (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-৬২-৬৩)

অনুবাদঃ ইন্দ্রিয়ের বিষয়সমূহ সম্বন্ধে চিন্তা করতে করতে মানুষের তাতে আসক্তি জন্মায়, আসক্তি থেকে কাম উৎপন্ন হয় এবং কামনা থেকে ক্রোধ উৎপন্ন হয়। ক্রোধ থেকে সম্মোহ, সম্মোহ থেকে স্মৃতিবিভ্রম, স্মৃতিবিভ্রম থেকে বুদ্ধিনাশ এবং বুদ্ধিনাশ হওয়ার ফলে সর্বনাশ হয়। অর্থাৎ, মানুষ পুনরায় জড় জগতের অন্ধকূপে অধঃপতিত হয়।- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-৬২-৬৩)

বাংলা অর্থঃ বিষয়গুলি নিয়ে চিন্তা করলে সেগুলির প্রতি মানুষের আসক্তি জন্মায়। আসক্তি থেকে জন্ম হয় কামনা, অর্থাৎ বিষয়ভোগের আকাঙ্ক্ষা। সেই কামনা প্রতিহত হলে জন্মায় ক্রোধ, ক্রোধ থেকে জন্ম নেয় সম্মোহ বা মূঢ়তা, মূঢ়তা থেকে হয় স্মৃতিভ্রংশ। স্মৃতিভ্রষ্ট হলে বুদ্ধিনাশ হয় এবং বু্দ্ধিভ্রষ্ট হয়ে গেলে হয় মানুষের বিনাশ বা পতন।- (স্বামী রামসুখদাস-৬২-৬৩)

রাগদ্বেষবিমুক্তৈস্তু বিষয়ানিন্দ্রিয়ৈশ্চরন্‌।

আত্মবশ্যৈর্বিধেয়াত্মা প্রসাদমধিগচ্ছতি।।৬৪

সরলার্থঃ কিন্তু যিন বিধেয়াত্ম অর্থাৎ যাহার মন নিজের বশবর্তী, তিনি অনুরাগ ও বিদ্বেয় হইতে বিমুক্ত, আত্মবশীভূত ইন্দ্রিয়গণদ্বারা বিষয় উপভোগ করিয়া আত্মপ্রসাদ লাভ করেন। – (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-৬৪)

অনুবাদঃ সংযতচিত্ত মানুষ প্রিয় বস্তুতে স্বাভাবিক আসাক্তি এবং অপ্রিয় বস্তুতে স্বাভাবিক বিদ্বেষ থেকে মুক্ত হয়ে, তাঁর বশীভূত ইন্দ্রিয়ের দ্বারা ভগবদ্ভক্তির অনুশীলন করে ভগবানের কৃপা লাভ করেন।- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-৬৪)

প্রসাদে সর্বদুঃখানাং হানিরস্যোপজায়তে।

প্রসন্নচেতসো হ্যাশু বুদ্ধিঃ পর্যবতিষ্ঠতে।।৬৫

সরলার্থঃ চিত্তপ্রসাদ জন্মিলে এই পুরুষের সমস্ত দুঃখের নিবৃত্তি হয়; যেহেতু প্রসন্নচিত্ত ব্যক্তির বুদ্ধি শীঘ্র উপাস্যে (ঈশ্বর) স্থিতি লাভ করে। – (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-৬৫)

অনুবাদঃ চিন্ময় চেতনায় অধিষ্ঠিত হওয়ার ফলে তখন আর জড় জগতের ত্রিতাপ দুঃখ থাকে না; এভাবে প্রসন্নতা লাভ করার ফলে বুদ্ধি শীঘ্রই স্থির হয়।- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-৬৫)

রাগদ্বেষবিমুক্তৈস্তু বিষয়ানিন্দ্রিয়ৈশ্চরন্‌।

আত্মবশ্যৈর্বিধেয়াত্মা প্রসাদমধিগচ্ছতি।।৬৪

প্রসাদে সর্বদুঃখানাং হানিরস্যোপজায়তে।

প্রসন্নচেতসো হ্যাশু বুদ্ধিঃ পর্যবতিষ্ঠতে।।৬৫

বাংলা অর্থঃ বশীভূতচিত্ত (অন্তঃকরণযুক্ত) সেই কর্মযোগী সাধক, অনুরাগ ও বিদ্ধেষমুক্ত হয়ে নিজ বশীভূত ইন্দ্রিয়গুলির দ্বারা বিষয় উপভোগ করে হৃদয়ে প্রসন্নতা লাভ করেন। হৃদয় প্রসন্নতা জন্মালে সাধকের সমস্ত দুঃখ দূর হয়। েইরূপ প্রসন্নহৃদয় সাধকের বুদ্ধি নিঃসন্দেহে অতি শীঘ্র পরমাত্মায় স্থিতি লাভ করে।- (স্বামী রামসুখদাস-৬৪-৬৫)

নাস্তি বুদ্ধিরযুক্তস্য ন চাযুক্তস্য ভাবনা।

ন চাভাবয়তঃ শান্তিরশান্তস্য কুতঃ সুখম্‌।।৬৬

সরলার্থঃ যিনি অযুক্ত অর্থাৎ যাঁহার চিত্ত অসমাহিত ও ইন্দ্রিয় অবশীভূত, তাঁহার আত্ম-বিষয়া বুদ্ধিও হয় না, চিন্তাও হয় না। যাঁহার (আত্ম-বিষয়া) চিন্তা নাই, তাঁহার শান্তি নাই, যাঁহার শান্তি নাই, তাঁহার সুখ কোথায়। – (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-৬৬)

অনুবাদঃ যে ব্যক্তি কৃষ্ণভাবনায় যুক্ত নয়, তার চিত্ত সংযত নয় এবং তার পারমার্থিক বুদ্ধি থাকতে পারে না। আর পরমার্থ চিন্তাশূন্য ব্যক্তির শান্তি লাভের কোন সম্ভাবনা নেই। এই রকম শান্তিহীন ব্যক্তির প্রকৃত সুখ কোথায়?- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-৬৬)

বাংলা অর্থঃ যার চিত্ত এ ইন্দ্রিয় সংযত নয়, তার ব্যবসায়াত্মিকা (নিশ্চয়াত্মিকা) বুদ্ধি হয় না। ব্যবসায়াত্মিকা বুদ্ধি না হওয়ায় তার মধ্যে নিষ্কামভাব অর্থাৎ কর্তব্যপরায়ণতা আসে না। নিষ্কামভাব না থাকায় তার শান্তি হয় না। যার শান্তি নেই, সে সুখী হবে কি প্রকারে?- (স্বামী রামসুখদাস-৬৬)

ইন্দ্রিয়াণাং হি চরতাং যন্মনোহনুবিধীয়তে।

তদস্য হরতি প্রজ্ঞাং বায়ুর্নাবমিবাম্ভসি।।৬৭

সরলার্থঃ মন বিষয়ে প্রবর্তমান ইন্দ্রিয়গণের যেটিকে অনুবর্তন করে, সেই একটি ইন্দ্রিয়ই, যেমন বায়ু জলের উপরিস্থিত নৌকাকে বিচলিত করে, তদ্রূপ উহার প্রজ্ঞা হরণ করে। – (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-৬৭)

অনুবাদঃ প্রতিকূল বায়ূ নৌকাকে যেমন অস্থির করে, তেমনই সদা বিচরণকারী যে কোন একটি মাত্র ইন্দ্রিয়ের আকার্ষণেও মন অসংযত ব্যক্তির প্রজ্ঞাকে হরণ করতে পারে।- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-৬৭)

বাংলা অর্থঃ নিজ নিজ বিষয়ে বিচরণশীল ইন্দ্রিয়গুলির মধ্যে কোনো এই ইন্দ্রিয় যখন মনকে নিজের বশীভূত করে, তখন সেই মন জলের উপরিস্থিত বায়ুতাড়িত নৌকার ন্যায় প্রজ্ঞাকে হরণ করে নেয়।- (স্বামী রামসুখদাস-৬৭)

তস্মাদ্‌ যস্য মহাবাহো নিগৃহীতানি সর্বশঃ।

ইন্দ্রিয়াণীন্দ্রিয়ার্থেভ্যস্তস্য প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিতা।।৬৮

সরলার্থঃ হে মহাবাহো, (যখন ইন্দ্রিয়াধীন মন এবং মনের অধীন প্রজ্ঞা) সেই হেতু, যাহার ইন্দ্রিয় সর্বপ্রকারে বিষয় হইতে নিবৃত্ত হইয়াছে, তাহারই প্রজ্ঞা স্থিত হইয়াছে। – (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-৬৮)

অনুবাদঃ সুতরাং, হে মহাবাহো! যাঁর ইন্দ্রিয়গুলি ইন্দ্রিয়ের বিষয় থেকে সর্বপ্রকারে নিবৃত্ত হয়েছে, তিনিই স্থিতপ্রজ্ঞ।- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-৬৮)

বাংলা অর্থঃ সেইহেতু, হে মহাবাহো! যে ব্যক্তির ইন্দ্রিয়সমূহ ভোগ্যবিষয়গুলি হতে সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাহৃত হয়েছে, তাঁরই প্রজ্ঞা স্থির হয়েছে বলে জানবে।- (স্বামী রামসুখদাস-৬৮)

যা নিশা সর্বভূতানাং তস্যাং জাগর্তি সংযমী।

যস্যাং জাগ্রতি ভূতানি সা নিশা পশ্যত্যে মুনেঃ।।৬৯

সরলার্থঃ সাধারণ প্রাণিগণের পক্ষে যাহা (আত্মনিষ্ঠা) নিশাস্বরূপ, তাহাতে (আত্মনিষ্ঠাতে) সংযমী ব্যক্তি জাগ্রত থাকেন; যাহাতে (বিষয়-নিষ্ঠাতে) অজ্ঞ প্রাণিসাধারণ জাগরিত থাকে, আত্মদর্শী মুনিদিগের তাহা (বিষয়নিষ্ঠা) রাত্রিস্বরূপ। – (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-৬৯)

অনুবাদঃ সমস্ত জীবের পক্ষে যা রাত্রিস্বরূপ, স্থিতপ্রজ্ঞ সেই রাত্রিতে জাগরিত থেকে আত্মবুদ্ধিনিষ্ঠ আনন্দকে সাক্ষাৎ অনুভব করেন। আর যখন সমস্ত জীবেরা জেগে থাকে, তখন তত্ত্বদর্শী মুনির নিকট তা রাত্রিস্বরূপ।- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-৬৯)

বাংলা অর্থঃ সমস্ত মানুষের পক্ষে যা নিশাস্বরূপ (পরমাত্মাতে বিমুখতা), তাতে সংযমী ব্যক্তি জাগরিত থাকেন এবং যাতে সাধারণ মানুষ জাগরিত থাকে অর্থাৎ ভোগ এবং সঞ্চয়ে নিমগ্ন থাকে, আত্মদর্শী মুনিগণের পক্ষে তা রাত্রিস্বরূপ।- (স্বামী রামসুখদাস-৬৯)

আপুর্য্যমাণমচল প্রতিষ্ঠং সমুদ্রমাপঃ প্রবিশন্তি যদ্‌বৎ।

তদ্‌বৎ কামা যং প্রবিশন্তি সর্বে

স শান্তিমাপ্নোতি ন কামকামী।।৭০

সরলার্থঃ যেমন নদ-নদীর জলে পরিপূরিত প্রশান্ত সমুদ্রে অপর জলরাশি আসিয়া প্রবেশ করিয়া বিলীন হইয়া যায়, সেইরূপ যে মহাত্মাতে বিষয়সকল প্রবেশ করিয়াও কোনরূপ চিত্তবিক্ষেপ উৎপন্ন করে না, তিনি শান্তিলাভ করেন, যিনি ভোগকামনা করেন, তিনি শান্তি পান না। – (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-৭০)

অনুবাদঃ বিষয়কামী ব্যক্তি কখনও শান্তি লাভ করে না। জলরাশি যেমন সদা পরিপূর্ণ এবং স্থির সমুদ্রে প্রবেশ করেও তাকে ক্ষোভিত করতে পারে না, কামসমূহও তেমন স্থিতপ্রজ্ঞ ব্যক্তিতে প্রবিষ্ট হয়েও তাঁকে বিক্ষুদ্ধ করতে পারে না, অতএব তিনিই শান্তি লাভ করেন।- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-৭০)

বাংলা অর্থঃ জলপূর্ণ সমুদ্রে যেমন নদ-নদীর জলরাশি এসে চরদিক থেকে পড়ে মিশে যায়, কিন্তু সমুদ্র নিজমহিমায় অচলরূপে বিরাজ করে; তেমনি যে সংযমী মানবের মধ্যে বিষয়সকল প্রবেশ করে বিলীন হয়ে যায়, কোনোরূপ বিকার উৎপন্ন করে না, তিনিই পরমশান্তি লাভ করেন। যিনি ভোগকামনা করেন, তিনি শান্তি পান না।- (স্বামী রামসুখদাস-৭০)

বিহায় কামান্‌ যঃ সর্বান্‌ পুমাংশ্চরতি নিস্পৃহঃ।

নিমর্মো নিরহঙ্কারঃ স শান্তিমধিগচ্ছতি।।৭১

সরলার্থঃ যে ব্যক্তি সমস্ত কামনা ত্যাগ করিয়া নিস্পৃহ হইয়া বিচরণ করেন, যিনি মমতাশূন্য ও অহঙ্কারশূন্য, তিনি শান্তি প্রাপ্ত হন। – (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-৭১)

অনুবাদঃ যে ব্যক্তি সমস্ত কামনা-বাসনা পরিত্যাগ করে জড় বিষয়ের প্রতি নিস্পৃহ, নিরহঙ্কার ও মমত্ববোধ রহিত হয়ে বিচরণ করেন, তিনিই প্রকৃত শান্তি লাভ করেন।- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-৭১)

বাংলা অর্থঃ যে ব্যক্তি সমস্ত কামনা পরিত্যাগ করে নিঃস্পৃহ মমতাশূন্য এবং অহংকাররহিত হয়ে আচরণ করেন, তিনিই শান্তি প্রাপ্ত হন।- (স্বামী রামসুখদাস-৭১)

এষা ব্রাহ্মী স্থিতিঃ পার্থ নৈনাং প্রাপ্য বিমুহ্যতি।

স্থিত্বাস্যামন্তকালেহপি ব্রহ্মণির্বাণমৃচ্ছতি।।৭২

সরলার্থঃ হে পার্থ, ইহাই ব্রাহ্মীস্থিতি (ব্রহ্মজ্ঞানে অবস্থান)। এই অবস্থা প্রাপ্ত হইলে জীবের আর মোহ হয় না। মৃত্যুকালেও এই অবস্থায় থাকিয়া তিনি ব্রহ্মনির্বাণ বা ব্রহ্মে মিলনরূপ মোক্ষ লাভ করেন। – (শ্রী জগদীশ চন্দ্র গীতা-৭২)

অনুবাদঃ এই প্রকার স্থিতিকেই ব্রাহ্মীস্থিতি বলে। হে পার্থ! যিনি এই স্থিতি লাভ করেন, তিনি মোহপ্রাপ্ত হন না। জীবনের অন্তিম সময়ে এই স্থিতি লাভ করে, তিনি এই জড় জগতের বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে ভগবৎ-ধামে প্রবেশ করেন।- (শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ (ইসকন)-৭২)

বাংলা অর্থঃ –হে পৃথানন্দন! একেই বলা হয় ব্রাহ্মীস্থিতি (ব্রহ্মজ্ঞানে অবস্থিতি)। জীবের এই অবস্থাপ্রাপ্তি হলে তিনি কখনো আর মোহগ্রস্ত হন না। মৃত্যুকালেও যদি এই অবস্থায় স্থিত হন, তাহলে নির্বাণ লাভ হয় অর্থাৎ তাঁর ব্রহ্মপ্রাপ্তি হয়।- (স্বামী রামসুখদাস-৭২)

ওঁ তৎসদিতি শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতাসূপনিষৎসু ব্রহ্মবিদ্যায়াং যোগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণার্জুন-সংবাদে-সাংখ্যযোগো নাম দ্বিতীয়োহধ্যায়ঃ।

ধন্যবাদ” 

=বাংলা হাউ ডট কম=

((www.banglahow.com))